ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৭ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

বিশ্বাস, রাজনীতি, এবং শক্তির এক অনন্য সংযোগস্থল

গির্জা থেকে মসজিদ: আয়া সোফিয়া কি সত্যিই ওয়াকফ সম্পত্তি?

প্রকাশিত: ০৮:৩৫, ৬ এপ্রিল ২০২৫

গির্জা থেকে মসজিদ: আয়া সোফিয়া কি সত্যিই ওয়াকফ সম্পত্তি?

সংগৃহীত

আয়া সোফিয়া শুধু তুরস্কের একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি একটি জাদুকরী প্রেক্ষাপট যা আমাদের দেখায় ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি এবং শক্তির পরিবর্তনশীল গতির সাথে কিভাবে সম্পর্কিত। ইস্তাম্বুলের (প্রাচীন কনস্টান্টিনোপল) কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই স্থাপনা ১৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খ্রিস্টান ও ইসলামিক জগতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। তবে, এই স্থাপনা শুধু দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য বা ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে নয়, বরং এটি একটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

বাইজেন্টাইন যুগের সাক্ষী

আয়া সোফিয়ার ইতিহাস শুরু হয় ৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে, বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্রথম এর নির্মাণ শুরু করেন। প্রায় ৯০০ বছর ধরে এটি কনস্টান্টিনোপলের প্যাট্রিয়াচাল গির্জা ছিল। এর স্থাপত্য ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিশাল, বিশেষ করে এর বিশাল গম্বুজ। এটি বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের শীর্ষতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল।

তবে, ১৪৫৩ সালে সুলতান ২য় মেহমেদ কনস্টান্টিনোপল জয় করার পর এক বিশাল পরিবর্তন আসে। তিনি আয়া সোফিয়াকে মসজিদে পরিণত করেন। এর সাথে যোগ করেন ইসলামী উপাদান যেমন মিনারেট এবং মিহরাব, কিন্তু খ্রিস্টান স্থাপত্যের অনেক অংশও রেখে দেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২য় মেহমেদ এর ঘোষণা যে এটি একটি ওয়াকফ সম্পত্তি,একটি আইনি দানমূলক প্রতিষ্ঠান, যা মসজিদ হিসেবে স্থায়ীভাবে থাকবে।

মসজিদ থেকে যাদুঘর, আবার মসজিদে ফিরে আসা

১৯৩৪ সালে, তুরস্কের আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলার সংস্কারের অংশ হিসেবে, আয়া সোফিয়াকে একটি যাদুঘরে পরিণত করা হয়। ৮৬ বছর ধরে এটি খ্রিস্টান ও ইসলামিক শিল্পকর্মের এক অপূর্ব মিলনস্থল হিসেবে কাজ করেছিল, যেখানে পর্যটকরা দুটো ধর্মীয় ধারার সৌন্দর্য একসাথে উপভোগ করতে পারতেন।

কিন্তু ২০২০ সালে, তুর্কি স্টেট কাউন্সিল একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়ে জানায় যে আয়া সোফিয়া আবারও মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। রায়টি ছিল ২য় মেহমেদ এর ওয়াকফ ঘোষণার আইনি ধারাবাহিকতায়, যেখানে বলা হয়েছিল যে আয়া সোফিয়া চিরকাল মসজিদ হিসেবে ব্যবহার হবে।

ওয়াকফের অর্থ কী?

ইসলামী আইনে, ওয়াকফ এমন একটি দানমূলক প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে একটি সম্পত্তি চিরকাল ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। ২য় মেহমেদ এর ওয়াকফ দলিলটি স্পষ্টভাবে জানায় যে, আয়া সোফিয়া একমাত্র মসজিদ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং এর উদ্দেশ্য পরিবর্তন করলে এটি মূল দানের নীতি লঙ্ঘন হবে। এই আইনি ভিত্তির উপর ভিত্তি করে ২০২০ সালের রায়টি দেওয়া হয়।

আজ আয়া সোফিয়া আবার মসজিদ হিসেবে কার্যকর, এবং পাঁচবার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তবে এটি সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত, এবং অনেক খ্রিস্টান মোজাইক এখনও দৃশ্যমান, বিশেষ করে নামাজের সময় বাদে। আয়া সোফিয়া আজও এমন একটি অনন্য স্থান, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম এবং রাজনীতি একসাথে মিশে গেছে, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে।

বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

আয়া সোফিয়া শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি তুরস্কের সমাজ এবং রাজনীতির এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি তুরস্কের আধুনিক রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় ইতিহাসের মধ্যে একটি সেতু গড়ে তুলেছে। এটা বিশ্বজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছে, এবং আমাদের দেখিয়েছে যে, কিভাবে একটি স্থান সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রভাবের অধীনে রূপান্তরিত হতে পারে, তবুও তার ইতিহাস এবং উদ্দেশ্য অটুট থাকে।

আয়া সোফিয়া শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাসের অংশ, যা বিশ্বের সামনে দৃশ্যমান করেছে যে কিভাবে একটি স্থান বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বাস, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনশীলতা সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাসের অক্ষত দিকগুলো সবসময় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, আমাদের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের গভীরতা পরীক্ষা করে।


সূত্র:https://tinyurl.com/mr3av5kc

আফরোজা

×