
ভারতে কেউ মর্মাহত, কেউ দুঃখিত, কিন্তু অনুতপ্ত নন। কেউ এখনই কিছু ভাবছেন না। আবার কেউ মনে করছেন, প্রতিবাদ করা উচিত ছিল সকলের। এঁরা হলেন মুদ্রার উল্টো পিঠ।
এঁরা হলেন সেই মামলাকারীদের একাংশ, যাঁদের উদ্যোগের ফলে প্রথমে কলকাতা হাই কোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরিয়েছে। যে রায়ে ২০১৬ সালের গোটা প্যানেল বাতিল হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ওই রায়ের ফলে চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার। তাঁদের অসহায়তার হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের জেলায় জেলায়। তাঁদেরই একাংশ কাঠগড়ায় তুলছেন তাঁদের, যাঁরা প্রথম মামলা করেছিলেন কলকাতা হাই কোর্টে! কাউকে কাউকে ‘একঘরে’ করার অভিযোগ উঠছে। কাউকে কাউকে লক্ষ্য করে কটূক্তিও করা হচ্ছে।
তাঁরা মামলা করেছিলেন বিচার চেয়ে। বিচারের রায় বেরোনোর পরে উল্টে তাঁরাই কাঠগড়ায়! অনেকে ফোনেও কথা বলতে চাইছেন না। অনেকে প্রকাশ করতে চাইছেন না পরিচয়। কিন্তু মানসিক ভাবে তাঁদেরও অনেকে ভেঙে পড়েছেন।
২০১৬ সালে এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘কারচুপি’ হয়েছে— এই মর্মে ২০২১ সালে কলকাতা হাই কোর্টে অভিযোগ জমা পড়েছিল। গ্রুপ ‘সি’ এবং গ্রুপ ‘ডি’ কর্মী, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগে ‘যথেচ্ছ দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে দায়ের হয়েছিল একগুচ্ছ মামলা। মামলাকারীদের অনেকেই ছিলেন ‘বঞ্চিত’ চাকরিপ্রার্থী। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২৬ হাজার (আদতে ২৫,৭৫২) চাকরি বাতিল হওয়ার পর অনেকের রোষ গিয়ে পড়েছে ওই মামলাকারীদের উপর। চাকরিহারাদের একাংশের বক্তব্য, নির্দিষ্ট কিছু চাকরিপ্রার্থী মামলা-মোকদ্দমার পথে না গেলে সকলকে এ ভাবে পথে বসতে হত না।
এসএসসির গ্রুপ ‘ডি’ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন নন্দীগ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মী তুঙ্গা। সুপ্রিম কোর্টের চাকরি বাতিলের রায় নিয়ে তিনি বলছেন, “আমি মর্মাহত। আমি চাকরি পাওয়ার জন্য মামলা করেছিলাম। কারও চাকরি খাওয়ার জন্য মামলা করিনি।” মামলা করা ছাড়া কি কোনও উপায় ছিল না? লক্ষ্মীর জবাব, “ক্রমতালিকা না-মেনে অন্যকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। আমায় বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাই মামলা করেছিলাম। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেও সেই বঞ্চিতই থেকে গেলাম।” কিন্তু চাকরিহারাদের একটি অংশ তো মামলা করে ‘আইনি জট’ পাকানোর জন্য তাঁদেরই দায়ী করছেন! লক্ষ্মী বলেন, “ওঁরা দোষী করতেই পারেন। দোষী-নির্দোষ নিয়ে চিন্তিত নই। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম। পরে তো আরও দুর্নীতি হতে পারত!” নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে তাতে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন নন্দীগ্রামের এই বাসিন্দা। তাঁর সাবধানি জবাব, “আবার যে পাশ করব, এমন নিশ্চয়তা কোথায়?”
ফুয়াদ