
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে ভারত সরকার মন্তব্য করার আগে এটি স্বীকার করা উচিত যে, তাদের নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের সাথে যে আচরণ করা হয়, তার একটি প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে দেখা যায়।
ভারতের পাক্ষিক ম্যাগাজিন "ফ্রন্টলাইন"কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) ম্যাগাজিনটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
নিরুপমা সুব্রহ্মণ্যমের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে, গত বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাতের পর বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ভারতীয় পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ২,৪০০টি এবং ২০২৫ সালে ৭২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কি এই পরিসংখ্যানগুলোকে অতিরঞ্জিত মনে করেন কিনা।
এ প্রসঙ্গে শিষ্টি অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশেষজ্ঞ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "এই ধরনের ঘটনা হিসাব করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। পুলিশ বাহিনী বিশৃঙ্খল ছিল এবং কিছু সময়ের জন্য নিরাপত্তার দায়িত্ব সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর হাতে চলে যায়, কিন্তু পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ছিল।"
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশের অনেক ধর্মীয় সংখ্যালঘু ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। তাই, কিছু ক্ষেত্রে এটি আলাদা করা কঠিন যে, কোনো হিন্দু ব্যক্তির ওপর আক্রমণ তাঁর ধর্মের কারণে হয়েছিলো, নাকি তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমর্থক ছিলেন।"
ড. দেবপ্রিয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রণয়নের কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্বপালন করছেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যেমন হিন্দু ও বৌদ্ধরা, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ। একইভাবে, ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যেমন মুসলমানরা, বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই, যখন ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে মন্তব্য করে, তখন তাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে— তাদের নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের আচরণের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের ওপরও পড়ে।"
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তিনি কতটা নিরাপদ বোধ করেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় বলেন, "আমি হয়তো এর সেরা উদাহরণ নই। আমি দুবার ভারতে শরণার্থী ছিলাম — প্রথমত ১৯৬০-এর দশকে দাঙ্গার পর ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। তবে আমার বাবা-মা কখনো বাংলাদেশ ছাড়েননি। আমি ফিরে এসেছি, আমার জন্মভূমিতে বিনিয়োগ করেছি এবং এখানেই আমার জীবন গড়েছি। আমি আমার দেশের জন্য অবদান রাখার জন্য মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদ ত্যাগ করেছি।"
তিনি আরও বলেন, "আমার পরিবারের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমার মা শেখ হাসিনার দলের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং আমার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নিযুক্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সংযোগগুলো আমার পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে না।"
পরিচয়ের রাজনীতি ভূমিকা পালন করলে বাংলাদেশে অবস্থান করার ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার এবং সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের — হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সংখ্যালঘু এবং সমতলভূমির আদিবাসী গোষ্ঠী — সুরক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্তর্ভুক্তির এই প্রতিশ্রুতিই জাতি গঠনের মূল কথা।"
সাক্ষাৎকারে সংবিধান থেকে "বহুত্ববাদ" শব্দটি বাদ দিয়ে "ধর্মনিরপেক্ষতা" শব্দটি বাদ দেওয়ার বিষয়ে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের বিষয়টিও তুলে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, "এটি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখিত একটি প্রস্তাব এবং এই বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অনেকগুলো মতামতের মধ্যে একটি।"
তিনি আরও বলেন, "এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের বিশেষত্ব, যেখানে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ পায় এবং কেউ কেউ আদর্শ বা রাজনৈতিক লাভের কারণে কট্টর অবস্থান গ্রহণ করে।"
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "বাংলাদেশের কিছু মানুষ ইতিহাস পুনর্লিখন করতে চায়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে— তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের জাতীয় নীতি নির্ধারণ করবে।"
সায়মা ইসলাম