
মঙ্গলবার বিকেল ৩টার রাজধানীর পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি সন্জীদা খাতুন। তার মৃত্যুতে সংস্কৃতিঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাকে নিয়ে কথা বলেছেন তার সহযোদ্ধরা...
মফিদুল হক: সন্জীদা খাতুন একজন মানুষ এত বিপুলভাবে সমাজকে দিয়ে গেছেন, এটার আমি কোনো তুলনা খুঁজে পাই না। অনেক রকম পরিচয়তো তার। এখন কোন পরিচয়টা বড়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী এটা খুব বড় পরিচয় এবং রবীন্দ্রনাথের গানের পরিবেশন এবং ব্যাখ্যা, তার তুলনীয় আসলে এই গোটা বাংলায় সমকক্ষ কেউ নেই। আবার তিনি সংগীতের শিক্ষাদান করে গেছেন আজীবন। মানুষকে গান শেখানোর আনন্দের সঙ্গে আর্থিক কোনোরকম সংযোগ কোনো সময়ই ছিল না। সেটা যে কেবল ছায়ানটকে ঘিরে, তা নয়। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের হয়ে সারাদেশের কত জায়গায় উনি গেছেন, ছেলেমেয়েদের গান শিখিয়েছেন। তার বাড়িতে যখন যে আসত গান শিখতে, সবার জন্য দরজা খোলা ছিল।
তিনি রক্তে-মজ্জায় অসাম্প্রদায়িক মানুষ। যে অসাম্প্রদায়িকতা আসলে বাঙালি সত্তার একেবারে প্রাণ, সেটা তিনি এমনভাবে ধারণ করেছেন। তার সঙ্গে তার জীবনাচার, তার যে একেবারে একটা নির্লোভ মধ্যবিত্তসুলভ একটা জীবন, যেখানে বাহুল্যবর্জিত একটা জীবনধারা, জীবনযাত্রা, আমরাতো এটার সাক্ষী। আজকের সমাজেতো সেটা অকল্পনীয়।
রামেন্দু মজুমদার: সন্জীদা খাতুন কোনোদিন আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে কোনোরকম আপোস করেননি। মনে হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির একটা বাতিঘর নিভে গেল। তিনি সারাজীবন ধরে একটা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে, যেভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন, আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন, এটা তার সারাজীবনের কীর্তি। একদিকে আমাদের ছায়ানট তার কীর্তি বহন করবে, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মধ্য দিয়ে সারাদেশে সংস্কৃতির বীজ বপন করেছেন। শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, নজরুল, লালন- সকল প্রকার শুদ্ধ সংগীতের প্রসারে তিনি অবদান রেখেছেন।
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : অত্যন্ত কষ্টের, বেদনার, যারা সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে যুক্ত, সবাই তাকে জানতাম আমরা যে, তিনি একজন সংগীত বিশারদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, সংগঠক, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা, গবেষকÑ কিনা তিনি। ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পদক পেয়েছেন, শান্তি নিকেতনের দেশিকোত্তম উপাধি পেয়েছেন, স্বাধীনতা পুরস্কার পেছেন। পুরস্কার পাওয়াটা বড় কথা না, বড় কথা হচ্ছে সারাজীবন তিনি বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতির জন্য লড়াই করেছেন। রমনার বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, তার পথিকৃৎ আমাদের সন্জীদা খাতুন। যদিও তার বয়স হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা তাকে দেখেছি। তার মস্তিষ্ক অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল। সমস্ত কথা বলছেন সবার সঙ্গে, শুধু শরীরটা যা হয় বয়সকালে, একটু খারাপ হয়েছিল, ডায়ালাইসিস করতে হতো।