ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

রপ্তানি বাজারে শুল্কের প্রভাব

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৩, ৫ এপ্রিল ২০২৫

রপ্তানি বাজারে শুল্কের প্রভাব

ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্কারোপ করেছেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্কারোপ করেছেন। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর। 
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুত শুল্ক যৌক্তিকীকরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে জরুরি বিভিন্ন বিকল্প চিহ্নিত করছে। ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে কাজ করে আসছি। আমাদের চলমান প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শুল্কসংক্রান্ত বিষয়টির সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
ট্রাম্প প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এর ফলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৈরি পোশাক খাত। পোশাক খাতে বাংলাদেশের যারা প্রতিযোগী দেশ, বিশেষ করে প্রধান প্রতিযোগী ভারত। ভারতের ওপর যে পরিমাণ শুল্কারোপ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং পোশাকের পরবর্তী অর্ডারগুলো অল্প সময়ের জন্য হলেও ভারতে যাবে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না আনে, তাহলে বাংলাদেশের অর্ডারগুলো ভারতে যাবে।
আমেরিকার বাজারে চীনের শুল্ক হার কম বাংলাদেশের তুলনায়। এজন্য চীন থেকে বড় বিনিয়োগ না আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতদিন ধারণা ছিল, মেড ইন বাংলাদেশ হলে আমেরিকার বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হয়ে যাবে সংকুচিত। যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে যে বিনিয়োগ বাংলাদেশে হয়েছে, সেগুলো হয়তো বাংলাদেশে আর নাও থাকতে পারে। বাণিজ্য, রপ্তানি ও বিনিয়োগ তিন খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। 
আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিক্ষীয় কাঠামোগত বাণিজ্যিক চুক্তি বা টিকফা আছে। এর মাধ্যমে সরকার আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারে। কিন্তু শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর থেকে সিদ্ধান্তটি হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছে হোয়াইট হাউস থেকে যা বাস্তবায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর। 
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। তাদের সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি এনবিআরকে কিছু জিনিস রিভিউ করতে হবে। আমেরিকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে কত শতাংশ শুল্ক আছে। আমাদের শুল্কহার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এর ওপর নানান কর থাকে। ওই করগুলো কীভাবে কমানো যায় খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এনবিআরকে ট্যারিফ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাড়তি শুল্কহারের কথা শুনে অনেক ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হতে পারে। বিশেষ করে পোশাক ব্যবসায়ী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। তারা উদ্বেগের মধ্যে পড়ে যাবে, শুল্ক তারতম্যের কারণে। তৈরি পোশাক রপ্তানি ও অন্য পণ্য রপ্তানি কমে গেলে সেটা দুশ্চিন্তার বিষয়। এমনিতেই দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্য অতিরিক্ত শুল্কারোপ সমস্যার সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, ‘যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার এবং রপ্তানি বাড়ানোর আরও সুযোগ আছে, তাই সরকারকে এটা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। যেখানে গড় শুল্ক বেশি আছে, সেখানে কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। অন্যদিকে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে তুলা আমদানি করি সেই তুলা দ্বারা প্রস্তুত করা পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ দাবি করা।

আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি ও পোশাক শিল্পের জন্য যেসব পণ্য আমদানি করি তার অধিকাংশ শুল্কমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ শতাংশ। খুব বেশি কর আমারা আরোপ করিনি। সুতরাং এটা যৌক্তিক বলে মনে হয় না।’ 
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেছেন, ‘সার্বিকভাবে যে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের আছে তার ওপর এখন যদি করহার বেড়ে যায় অর্থাৎ বাংলাদেশী পণ্যকে বেশি ট্যাক্স দিয়ে আমেরিকান মার্কেটে ঢুকতে হয়, সেটা আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও চাপের মধ্যে পড়বে।’
এ সমস্যা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তির জন্য তিনি কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছেন। ‘আমাদের দ্রুত আমেরিকান পণ্যের যে লিস্ট আছে যা তারা বাংলাদেশে রপ্তানি করে সেই লিস্ট থেকে কিছু পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর কর কমিয়ে দিলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক কর ও সম্পূরক শুল্কের কারণেও অনেক সময় করহার বেড়ে যায়। সুতরাং সেই সেক্টরের পণ্যগুলোতে সম্পূরক শুল্ক কীভাবে কমানো যায় সেটা একটু দেখতে হবে।
টেকসই বাণিজ্যের জন্য আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই জায়গায় মূল হচ্ছে আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দক্ষতা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে অবকাঠামো, বিশেষ করে রপ্তানির ক্ষেত্রে লজিস্টিকস অবকাঠামোতে অনেক দুর্বলতা আছে, সেটা আমাদের ঠিক করতে হবে।’
বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ রপ্তানি হয় এ দেশটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলার, যা প্রধানত তৈরি পোশাক থেকেই হয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলারে। 
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘আমার মনে হয় এই নতুন বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশের উচিত হবে নতুন বাজার খোঁজা। উদীয়মান বেশ কিছু বাজার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কিছু কিছু দেশ রয়েছে। অথবা দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া। এসব দেশেও বাংলাদেশের নজর রাখা উচিত। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মাথায় রেখে বাংলাদেশের উচিত হবে এখন থেকে আলাদা আলাদা দেশের জন্য আলাদা পদক্ষেপ নেওয়া।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ১০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬০১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের লোহার ইস্পাত আমদানি করে, তারপরে খনিজ জ্বালানি ৫৯৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, তুলা ৩৬১ মিলিয়ন ডলার, তেল বীজ ৩৪১ মিলিয়ন ডলার এবং নিউক্লিয়ার রেক্টর আমদানি করে ১১১ মিলিয়ন ডলারের।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগ আসে পোশাক থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ৭ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। বাকিটা এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, চামড়ার জুতা, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে।

অর্থনীতি ডেস্ক

×