ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়

চীন-বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১১, ৫ এপ্রিল ২০২৫

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

গত মাসের শেষ সপ্তাহে চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সফরে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি ও কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ উভয় দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দুই দেশের সরকারপ্রধান।
ড. ইউনূসের এ সফরের সফলতা ও প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। সফর ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছে তা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি জোর দেওয়ার কথাও বলেছেন তারা।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এর সফলতার বিষয়েও আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। চীনা সরকার যেভাবে ইতিবাচকভাবে সম্পর্ক উন্নত করার জন্য এগিয়ে এসেছে, তা আমাদের জন্য ইতিবাচক।’
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনোলজিনির্ভর খাতে ইনভেস্টমেন্ট আসবে এবং এই সেক্টর সামনে আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
চীন আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। তাদের থেকে আমরা বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা নেই। কাঁচামাল আমদানিরও সবচেয়ে বড় বাজার। চীন থেকে বিনিয়োগ সরে আসছে। কিন্তু আমরা বিনিয়োগপ্রত্যাশী। চীন সরকার তাদের ব্যবসায়ীদের উৎসাহী করবে এখানে বিনিয়োগ করতে। এটা দেশের জন্য বড় অর্জন।
এ সম্পর্কের সূত্র ধরে চায়নার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আরও উন্নতি ঘটবে, যেটা শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখবে। 
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য এ সফরে অনেক বিষয় আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাজার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি। 
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী করার কথা বলেছেন। এটা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ।’
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেছেন, ‘আমরা যত তাড়াতাড়ি তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দিতে পারব, তত তাড়াতাড়ি তারা এখানে আসবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার বিভিন্ন খাত রয়েছে। শুধু একটি বিশেষ অঞ্চল নয়, বিভিন্ন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে।’
আমরা চায়নিজ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হলে। আমাদের রিফর্ম ও ব্যবসায়িক পরিবেশ করতে হবে আরও উন্নত, যাতে চীনা বিনিয়োগ এখানে আসে এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি, রপ্তানি খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেছেন, ‘ড. ইউনূসের চীন সফর ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক উৎসাহব্যঞ্জক। এত বড় একটা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুপার শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের বৈঠক হওয়া দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য এ সফর সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’
চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীরতর হবে। সফরের সময় টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি চুক্তি সই হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে ইকোনমিক সম্পর্ক আরও বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। কমপক্ষে ৩০টির মতো চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা আমাদের জন্য একটা বড় আশার আলো দেখাচ্ছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রকাশ করার মানে এই নয় যে তারা অবশ্যই আসবে। তাদের আসা নির্ভর করবে আমরা তাদের জন্য কোন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারব তার ওপর। এছাড়াও ব্যবসায়িক পরিবেশ তাদের জন্য কতটা সহায়ক হবে। 
আমাদের উচিত হবে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা ও তাদের সুষ্ঠুভাবে ব্যবসা করার জন্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া। তাহলে চীনের বিনিয়োগ এখানে সহজেই আসবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনে আমাদের যে চলমান ঋণ রয়েছে তার সুদের হার কমানোর বিষয়ে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ভালো উদ্যোগ। এছাড়াও চায়না এ দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বাণিজ্য সম্প্রসারণে। 
কারণ সামনে আমাদের জিএসপি সুবিধা থাকবে না। এক্ষেত্রে শুধু এফটিএ করলেই হবে না, আমরা ইতোমধ্যে শুল্ক ফ্রি সুবিধা পাচ্ছি কিন্তু এর সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। 
তা না হলে আমরা লাভবান হতে পারব না। 
চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে সরকারই আসুক তারা নীতির পরিবর্তন করবে না এবং সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে উভয় দেশের স্বার্থে।
বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং চীনে রপ্তানি করেছে ৪৬১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। গত অর্থবছরে চীন থেকে মোট আমদানির পরিমান ছিল ১৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে রপ্তানি ছিল মাত্র ৭১৫ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল এক হাজার ৮৫০ দশমিক ৪০ কোটি ডলারের। চীন থেকে এক হাজার ৭৮২ দশমিক ৬৬ কোটি ডলারের আমদানির বিপরীতে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৭ দশমিক ৭৩ কোটি ডলার। বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৭১৫ কোটি ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ৩৪১ দশমিক ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। আর বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি ছিল প্রায় ১০ কোটি ডলার।
চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে তুলা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২২৫ কোটি ডলারের তুলা আমদানি করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি হয়েছে নিউক্লিয়ার রেক্টর ও বয়লার- যার মূল্য ছিল ২১৫ কোটি ডলার। ইলেক্ট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র আমদানি হয়েছে ১৭২ কোটি ডলারের। 
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে আরও প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন তারা।
অর্থনীতি প্রতিবেদক

×