ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১

বাংলাদেশী পণ্যে মার্কিন শুল্ক নিয়ে কাল জরুরি বৈঠক

অর্থনীতির ধকল সামলাতে কাজ শুরু করছে সরকার

এম শাহজাহান

প্রকাশিত: ০০:০০, ৫ এপ্রিল ২০২৫

অর্থনীতির ধকল সামলাতে কাজ শুরু করছে সরকার

সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

ঈদের ছুটির পরই অর্থনীতির ধকল সামলাতে তিন বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশী পণ্যের ওপর নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ মোকাবিলা করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি নিশ্চিত করা এবং একটি সময়োপযোগী বাজেট প্রণয়ন করে তা দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন।

আজ শনিবার ঢাকায় আসবে আইএমএফের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আগামী দু’সপ্তাহ নাগাদ তারা সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর এবং অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে জুনের মধ্যে ঘোষিত ঋণের কিস্তি প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানাবে। ফলে, আইএমএফ প্রতিনিধি দলের এবারের সফরটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। 
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের কারণে দেশটির বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের শুল্ক পর্যালোচনা করতে আগামীকাল রবিবার অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা অংশগ্রহণ করবেন বলে নিশ্চিত করেছে অর্থমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এছাড়া আগামী জুনের প্রথম সপ্তায় আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট এবার টেলিভিশনে উপস্থাপন করবেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। লক্ষ্য বাজেট প্রণয়নের কাজটিও দ্রুত এবং গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। বাজেটে করের হার বাড়ানো এবং ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনার বিষয়ে আইএমএফের নির্দেশনা রয়েছে। সংস্থাটির এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, দেশের কৃষি খাত এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। 
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন অর্থবছরে আট লাখ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের প্রায় সমান ও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ বেশি। উন্নয়ন বাজেট দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে রাখা হতে পারে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ দুই লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার তুলনায় সামান্য বেশি।

আগামী ৯ এপ্রিল বুধবার নির্ধারিত আর্থিক সমন্বয় কাউন্সিলের বৈঠকে বাজেটের পরিধি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে আগামী ৬ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের জন্য ঢাকায় থাকা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মিশনের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত পরিধি ঠিক করা হবে। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় (এলডিসি উত্তরণ) পৌঁছবে বাংলাদেশ।

শিল্পোদ্যোক্তারা এলডিসি পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করা গেলে চলমান এই সঙ্কট এবং চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ সম্ভব। এজন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এদিকে, ঈদের ছুটির পর রবিবার থেকে সরকারি অফিসগুলো খুলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি কিছু কিছু অফিসে কাজকর্ম শুরু হয়েছে।

অফিসের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের ফলে দেশের রপ্তানি খাত কতটুকু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং তা মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ করবে সরকার। অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সেই বৈঠকে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করেছে, সরকার তা পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে ঈদের ছুটি থাকায় বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। ঈদের ছুটি শেষে আগামীকাল রবিবার থেকে অফিস শুরু হবে। অফিস শুরুর দিনেই এই শুল্ক নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করেছে তা উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।

ঈদের ছুটি শেষে রবিবার অফিস খুলবে, এ দিনই এই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দেশ তীর্যক মন্তব্য করেছেন। নতুন শুল্ক আরোপের ফলে আমরা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারি, তা নিয়ে রবিবারের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হতে পারে। উল্লেখ্য, এতদিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল।

নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই শুল্কের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজারটিতে পণ্য রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র এবং একক দেশ হিসেবে সেখানেই সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। 
জুনের কিস্তি নিয়ে আলোচনা করতে আজ আসছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল ॥ আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তির আওতায় আগামী জুন মাসে দুটি কিস্তি পাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু এর আগেই সংস্থাটির উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল তাদের ঋণের শর্তগুলো পর্যালোচনা করতে আজ ঢাকায় আসছে।   প্রতিনিধি দলটি রবিবার সকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করবে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে বিভিন্ন শর্ত পালনের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আইএমএফের একটি দল আজ শনিবার ঢাকায় আসছেন। দলটি ৬ এপ্রিল থেকে টানা দুই সপ্তাহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে। এ সফরে আইএমএফের দলটির সঙ্গে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব  বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে ১৭ এপ্রিল প্রেস ব্রিফিং করবে সফররত আইএমএফের দল। 
আইএমএফের শর্তের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনও স্বস্তির জায়গায় পৌঁছায়নি। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা আবার মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। তাই সরকারকে হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং আইএমএফেরও বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝা উচিত।

উভয় পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ কর্মসূচি বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এদিকে, আইএমএফের সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সংস্থাটি রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও বাংলাদেশের ক্রমাগত নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত মোকাবিলায় অন্যান্য উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে।

আইএমএফ মিশনের সফরের সময় গৃহীত কর সংস্কারের বিষয়ে একমত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা করছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি।

×