
পোশাক রপ্তানিকারকের মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হলে বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নেওয়া অথবা তা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্মাণ সামগ্রী, কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি করে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করে যা পাওয়া যায়, তার শতাংশ ধরে ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর হার হয় ৭৪ শতাংশ। এর অর্ধেক বা ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে বাংলাদেশের পণ্যে। দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, ‘শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক কাঠামোর ফলে ভারত ও পাকিস্তান থেকে পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের তুলনায় সস্তা হতে পারে। কারণ সেসব দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল, পুরানো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ। গত অর্থবছরে পণ্যটি আমদানি হয় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। গড়ে ৪ শতাংশ শুল্কহার রয়েছে পুরানো লোহার পণ্য আমদানিতে। আমদানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য হলো এলপিজির উপাদান বিউটেন। গত বছর এই পণ্য আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। বাংলাদেশের শুল্কহার গড়ে ৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হলো সয়াবিন বীজ। সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য তৈরির এই কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩২ কোটি ডলারের। এই পণ্য আমদানিতে শুল্ককর নেই। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। এই পণ্য আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের। এটিতেও শুল্ককর নেই। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তালিকায় আরও রয়েছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, হুইস্কি, গাড়ি, গম, উড পাল্প, পুরানো জাহাজ, সয়াকেক, কাঠবাদাম ইত্যাদি।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া সর্বোচ্চ শুল্ককর আছে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে হুইস্কি। হুইস্কিতে শুল্ককর ৬১১ শতাংশ। তবে আমদানি খুবই কম। গত বছর ২২৮ বোতল জ্যাক ডেনিয়েল হুইস্কি আমদানি হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শুল্ককরযুক্ত পণ্য হলো মার্সিডিজ বেঞ্জ। এই গাড়িতে শুল্ককর ৪৪৩ শতাংশ। গত বছর আমদানি হয়েছে চারটি গাড়ি।
আমদানি কীভাবে বাড়ানো সম্ভব ॥ ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে দুইটি বিষয়ের ওপর জোর দেন। আমদানিতে খরচ কত এবং পণ্যের মান কেমন? তবে শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে কত কম সময়ে আনা যাবে, তাও গুরুত্ব দেন ব্যবসায়ীরা। শুল্ককরের হার সব দেশেই প্রায় একই। কিছু মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় (যেমন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা সাফটা) নির্ধারিত পণ্যে শুল্ক সুবিধা রয়েছে। এখন বেসরকারি আমদানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে উৎসাহ দিতে হলে শুল্ককরে সুবিধা দিতে হবে। কারণ, খরচ কম পড়লে সেখান থেকে আমদানিতে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা। আবার যেসব পণ্যে শুল্কহার নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ভাবতে হবে। যেমন এনবিআরের হিসাবে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ৪৪ শতাংশে কোনো শুল্ককর দিতে হয়নি। এই তালিকায় রয়েছে সয়াবিন বীজ, তুলা ইত্যাদি। তবে আমদানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকার। যেমন সরকার যেসব পণ্য আমদানি করে তার তালিকায় রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এয়ারক্রাফট ও যন্ত্রাংশ, অস্ত্র ইত্যাদি। গত বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এয়ারক্রাফট ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানি করেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ডলারের। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশই আক্রান্ত হচ্ছে না। প্রায় ৬০ দেশে এর প্রভাব পড়বে। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপরও শুল্ক বেড়েছে। পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হিসাব করেছে তাতে আমাদের আমদানি বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে যদি আমদানি বাড়াতে পারি, তাহলে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুল্ককর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আনা হলে সহজভাবে আমদানি বাড়বে। কারণ, মার্কিন উদ্যোক্তারা নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করবেন। তিনি বলেন, টিকফার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান তুলে ধরে শুল্ক হ্রাসের আলোচনা শুরু করতে হবে। আমাদের জানতে চাইতে হবে কিসের ভিত্তিতে তারা ৭৪ শতাংশ শুল্কের হিসাব করল।