ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২১:০৬, ৩ এপ্রিল ২০২৫

অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে করের হার বাড়িয়ে আরও অতিরিক্ত ৫৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ ছাড়া সংস্থাটি ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনা এবং করছাড় কমিয়ে আনার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের যে ঋণ চুক্তি রয়েছে তা বাস্তবায়নে সংস্থাটির বেশকিছু শর্ত রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে-জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো। এ ছাড়া শর্ত পূরণ না হওয়ায় আইএমএফের ঋণের কিস্তি ছাড় নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।  
উল্লেখ্য, এনবিআর বছরের শুরুতে অপ্রত্যাশিতভাবে কর বৃদ্ধির পর বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে আইএমএফ এখন আরও কর বাড়ানোর চাপ দিচ্ছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এ অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা না গেলে আইএমএফ-এর ঋণের চতুর্থ কিস্তি যা ইতোমধ্যে মার্চ থেকে বিলম্বিত হয়েছে এবং আসন্ন পঞ্চম কিস্তি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আইএমএফ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দাবিগুলো জানায়নি। তবে ৬ এপ্রিল ঢাকায় সংস্থাটির প্রতিনিধি দল আসার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্ত উপস্থাপন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনবিআরের জন্য এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তাদের মতে, শুধু কর ছাড় কমানো বা বিদ্যমান করের হার বাড়িয়ে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব নয়, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি মন্থর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, উৎপাদন সংকট ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতার মতো সমস্যার মুখোমুখি। এ প্রসঙ্গে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, জানুয়ারির কর বৃদ্ধির ধাক্কা এখনো পুরোপুরি সামলানো যায়নি। তা ছাড়া সব কর ছাড় একসঙ্গে বাতিল করাও সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইএমএফের কঠোর ঋণ শর্ত মেনে চলা বাংলাদেশের জন্য আদর্শ না-ও হতে পারে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ জানিয়েছেন, সরকার যদি আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা করে, তাহলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে। আদতে শুধু কর বাড়িয়ে বা ছাড় কমিয়ে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব নয়। অতীতে অনেক দেশ আইএমএফের শর্ত মেনে চলতে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। তার মতে, বাংলাদেশকে নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থনীতি পরিচালনার পরিকল্পনা নিতে হবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সুপারিশের কারণে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়া উচিত নয়। তা ছাড়া আমাদের তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ারও সুযোগ নেই।
২০২৩ সালের শুরুতে স্বাক্ষরিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তির অংশ হিসেবে আইএমএফ ৩০টিরও বেশি সংস্কারের শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে বার্ষিক রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। জানুয়ারিতে ভ্যাট ও কর বৃদ্ধির পরও রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে মতবিরোধের কারণে চতুর্থ ঋণের কিস্তি ছাড় বিলম্ব হচ্ছে। বাংলাদেশ আগামী জুন মাসে দুইটি কিস্তি পাওয়ার আশা করছে। তার আগে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে ঢাকা সফর করবে। আগামী ৬ এপ্রিল প্রতিনিধিদলটি অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এবং পরদিন এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআর ৩.৮২ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল, যা ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রাজস্ব আদায় হয়েছে ২.১৮ লাখ কোটি টাকা, আর প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে দুই শতাংশের নিচে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪.৮ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৪.৬৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, সংস্থাটি কখনো কোনো অর্থবছরে কেবল কর বৃদ্ধির মাধ্যমে ৫৭ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করতে পারেনি।
তা ছাড়া, কর ছাড় কমিয়ে কতটুকু অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এনবিআর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গবেষণা করেনি। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আমদানি শুল্ক মিলিয়ে কর ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে কিছু কর ছাড় পুরোপুরি তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য কিছু কর ছাড় বিশেষ করে আয় করের ক্ষেত্রে বাতিল করা যেতে পারে। তবে, তা রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। যেমন, সরকার প্রতি বছর মৎস্য খাতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কর ছাড় দেয়। এ সুবিধার আওতায় অনেকেই তাদের প্রকৃত আয়ের তুলনায় কম কর প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘যদি এ কর ছাড় প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে মৎস্য খাতে দেখানো আয়ের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে, ফলে প্রকৃত কর আদায়ও ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কেবল কর ছাড় কমানোর সুপারিশ করেনি, বরং কিছু নির্দিষ্ট খাতে নতুন বা বর্ধিত কর আরোপের পরামর্শও দিয়েছে। তবে, শুধু কর হার বাড়ালেই যে রাজস্ব বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। এর একটি উদাহরণ তামাক খাত।
গত ৯ মাসে দুই দফা কর বৃদ্ধির পরও বিক্রি কমে যাওয়ায় এ খাত থেকে প্রকৃত রাজস্ব পূর্বাভাসের অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। একইভাবে রেমিটেন্সের ওপর করমুক্ত সুবিধা অপসারণ করলে রেমিটেন্স প্রবাহ নিরৎসাহিত হতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে প্রভাবিত করতে এবং অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এনবিআরের ওই কর্মকর্তা বলেন, শুধু কর বাড়ালেই রাজস্ব বাড়বে না। কর ফাঁকি রোধ, করজালের সম্প্রসারণ এবং করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য অটোমেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা জরুরি বলে পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এনবিআরের এ অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাব করব্যবস্থার সংস্কারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঋণ ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা ॥ আইএমএফের সংস্কার পরিকল্পনার বড় অংশ এনবিআর বাস্তবায়ন করলেও সরকার এখনো কিছু প্রধান শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বেশিরভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-একটি একীভূত ভ্যাট হার চালু করা, রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার গ্রহণ এবং সরকারি ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ। বিশেষ করে, রাজস্ব ঘাটতি এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার না থাকায় আইএমএফ সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ফলে সংস্থাটি ঋণের নির্ধারিত কিস্তি প্রদানে বিলম্ব করছে। ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেন, আইএমএফ যদি ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখে, তাহলে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোও তাদের বাজেট সহায়তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসতে পারে।

×