
ছবি: জনকণ্ঠ
সাধারণত ড্রাগন গাছে ফুল আসে এপ্রিল মাসে। সেই সময় দিন বড় হয়, তাই আলো বেশি থাকে। রোদের তাপমাত্রাও বেশি থাকে। তবে আগাম চাষে ড্রাগন ফুল ও ফল পেতে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন তিন চাষি। ড্রাগন ফলের কাছে দিনকে ১৯ ঘণ্টা বানাতে জমিতে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে কৃত্রিম দিন তৈরি করা হয়েছে। এভাবে ড্রাগন গাছকে বোঝানো হচ্ছে যে দিন দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তেজখালি ইউনিয়নের গোটকান্দি গ্রামের তিন বন্ধু চাষি ইকবাল, বিল্লাল ও সুজন প্রথমে শখের বশে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। পরে সেই শখই পেশায় রূপ নেয়। এরপর তারা বাণিজ্যিকভাবে ১ একর জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। গতানুগতিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল না থেকে লাভজনক ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন বাঞ্ছারামপুরের চাষিরা। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ড্রাগনের চাষ বাড়ছে। এখানকার মাটি এ ফল চাষের জন্য উপযোগী। পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনেক চাষি।
ড্রাগন ফল দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। পাতাবিহীন এই ফলটি ডিম্বাকৃতির ও লাল রঙের। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ফলের বাইরের খোসা দেখতে রূপকথার ড্রাগনের পিঠের মতো, যা থেকে এর নামকরণ হয়েছে। এটি প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, মিনারেল এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত। জুস তৈরির জন্য ফলটি অত্যন্ত উপযোগী।
তিন বন্ধু চাষি ইকবাল, বিল্লাল ও সুজন তাদের ড্রাগন গাছে আগাম ফুল ও ফল পেতে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে কৃত্রিম দিন তৈরি করেছেন। তাদের সফলতা দেখে অনেকেই এখন এ পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বাগানের মালিক বিল্লাল বলেন, "বর্তমানে আমাদের বাগানে প্রায় ৬ হাজার ড্রাগন গাছ রয়েছে। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা। বাগান থেকে এ পর্যন্ত ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিটি গাছেই ফল আসা শুরু করেছে। আশা করছি, এ বছর ৬-৭ টন ফল সংগ্রহ করা যাবে। এ সময়ে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে ড্রাগন কিনে নিচ্ছেন।"
বাগানের আরেক মালিক ইকবাল জানান, "বাগানটির নিরাপত্তার জন্য ৬টি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এখান থেকে ড্রাগনের চারাও বিক্রি করা হয়। জাত অনুযায়ী চারার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন চারা ৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৯০ টাকা করে বিক্রি করা হয়।"
সরেজমিনে দেখা যায়, ১ একর জমিতে কৌশল পরিবর্তন করে ড্রাগন চাষ করেছেন তিন উদ্যোক্তা। সবুজ রঙের গাছে ঝুলছে ছোট-বড় ড্রাগন ফল। কিছু গাছে ফুল আসছে। তারা ২০২২ সালে ১ একর জমি লিজ নিয়ে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাধারণ পদ্ধতিতে চাষ করেছেন। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন শীতকালে ড্রাগন চাষের প্রযুক্তি তাদের শিখিয়ে দেন। সে অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ড্রাগনের ফুলে পরাগায়নের জন্য ৩ ঘণ্টা লাইট জ্বালানো হয়, যাতে জমি দিনের আলোর মতো হয়ে যায়। ফলে বাগানে প্রচুর ফুল ও ফল হয়েছে। বাগানটি একনজর দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ। অনেকে পরামর্শ নিচ্ছেন এবং কেউ কেউ ড্রাগন চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, "ড্রাগন একটি পুষ্টিকর ফল। বাঞ্ছারামপুরে প্রায় ২২ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। বাগানটিতে রেড ভেলভেট, ভিয়েতনামী লাল, বারি ড্রাগন-১ ও বারি ড্রাগন-২ জাতসহ বিভিন্ন জাতের লাল, সাদা ও হলুদ ড্রাগন রয়েছে। কৃষি অফিস থেকে এখানে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। বাগানে কোনো রাসায়নিক কীটনাশক, হরমোন বা টনিক ব্যবহার করা হয় না। ফলে ফলগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।"
সায়মা ইসলাম