
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি মুদ্রানীতি (এমপিএস) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়া ড. আহসান এইচ মনসুর প্রথমবারের মতো মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন। এবারের মুদ্রানীতি প্রণয়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমনÑ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। ২০২৫ সালের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে মূল্যস্ফীতি যা বিদায়ী ২০২৪ সালেও ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে বছরজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এখনো দ্রব্যমূল্য কমাতে পারেনি। এখানে উল্লেখ্য, ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ ও নীতি সুদহার রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ। প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও এ সময়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। আর দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১৭ শতাংশ। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই নীতি সুদহার ধরে রাখার পেছনে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই রাখা হয়েছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থের জোগান কমাচ্ছে। বাস্তবতা হলো শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অন্য যেসব বিষয় রয়েছে সব সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে প্রত্যাশা বাস্তবতার নিরিখে সেটি কতটুকু বাস্তবসম্মত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাত বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাট অংশ অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। নানা পদক্ষেপ নিয়েও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। অর্থের প্রবাহ কমাতে গিয়ে বিনিয়োগের অর্থ সংকট যেন তৈরি না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ হ্রাস পেলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হলো বেসরকারি খাত। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। সরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটিকে ঋণবঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আরও বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরও নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শীতকালীন সবজির দাম কমার প্রভাবে গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছিল। তবে এ প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, মৌসুম শেষ হয়ে গেলেই সবজির দাম আবার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের দাম তো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়ই রয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান করার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে, মুদ্রানীতির মাধ্যমে আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা অর্জনে কাজ করে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির ক্রিয়াকলাপের জন্য একক ক্ষমতার নীতি সুদহারের পাশাপাশি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ও সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)।
ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্তর, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। বলা যায়, মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করা হয়। একই উদ্দেশ্য নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এভাবে উচ্চ সুদহার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুযোগ নেই। তা ছাড়া বেসরকারি খাতে চাপ আরও বাড়বে। সুদহার বেশি থাকায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমবে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমলে বিনিয়োগ কম হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নীতি এই তিনটিকে একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে আমদানি শুল্ক কমাতে হবে যাতে পণ্য আমদানি ব্যয় কমে। বাজারে মুদ্রা সরবরাহের গতি নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্ফীতির ওঠানামাকরণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে সূত্র তা আর কাজে আসছে না। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে তুলেও মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। তাই আপাতত এই ভোঁতা হাতিয়ার সাবধানে চালাতে চাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসন্ন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আর বাড়ছে না। তবে এখনই না কমিয়ে উৎপাদন খাতে কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ আসতে পারে। দেশে মূল্যস্ফীতির পেছনে আরও বড় দুটি কারণ রয়েছে। যার একটি হচ্ছে ডলার সংকট, অপরটি বাজার ব্যবস্থাপনা। ডলার সংকটের ফলে আমদানি, ভোগ্যপণ্যের জোগান ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, এমন পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিই এখন বেশি তা শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে কমানো মোটেই যৌক্তিক নয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বাজার ব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা থাকে। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা যদি উন্নত করা না যায়, তাহলে শুধু খুচরা পর্যায়ে মূল্য বেঁধে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। খুচরা পর্যায়ে যারা আছে তারা তো বাজার কারসাজির এই খেলার মধ্যে নেই। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ডলার সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে ডলার না আসা ও হুন্ডি। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের দরের পার্থক্য এত বেশি হয়ে গেছে, মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলেই রেমিটেন্স বেশি পাঠাতে আগ্রহী। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নেতৃত্ব দিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে বাস্তবতার নিরিখে লক্ষ্য নির্ধারণ ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দিয়ে রোডম্যাপ তুলে ধরা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।