
ছবি: সংগৃহীত
মিষ্টি তৈরি একটি বিশেষ কলা। যারা মিষ্টি তৈরি করেন তাদের বলা হয় ময়রা। কিন্তু ময়রা শব্দটির সাথে অনেকে পরিচিত নয়। তাদের চেনা যায় মিষ্টির কারিগর বললেই। দেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুরকে বাহের দেশ বলা হয়। এই বাহের দেশে বিশেষ কিছু মিষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন মিষ্টির কারিগর বা ময়রারা। তাঁদের নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতায় ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠেছে মিরগড়ের রসাল টোপা, বেলাইচন্ডির বালুশাহী, সৈয়দপুরের মনসুরী, ডোমারের বরফি ও বীরগঞ্জের মণিঘোষের নামকরা রসগোল্লা।
টোপা: পঞ্চগড়ের ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি একবার খেলে আবার খেতে ইচ্ছা করবে। মীরগড়ের টোপার ঐতিহ্য এখন পঞ্চগড় জেলার অন্যতম ব্যান্ড। পঞ্চ বা পাঁচটি গড়ের সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চগড়। তারই একটি মীরগড়। এখানে যারা বেড়াতে আসেন, তারা টোপার রসে মজে যান। মীরগড় বাজারে গেলে দুই ধরনের টোপা পাওয়া যাবে। একটি চিনি দিয়ে বানানো, অন্যটি গুড়ের।
টোপার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মীরগড়ে আন্ধারী রানী নামের এক প্রবীণ নারী বসবাস করতেন। তিনি মজাদার এই মিষ্টি নিজ হাতে বানাতেন। আন্ধারী রানীর হাত ধরে মোমিনপাড়ার দুখু মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি টোপা তৈরী শিখেন নেন। আন্ধারীর মৃত্যুর পর তিনি এই মিষ্টি বানানো শুরু করেন। স্বাধীনতার পর দুখু মারা যান। এর পর থেকে টোপা বানাচ্ছেন দুখুর ছেলে আজিজুল ইসলাম। এখন টোপা বানানো ও বিক্রিতে আজিজুলকে সহায়তা করছেন তাঁর ছেলে জাহের আলী। বংশপরস্পরায় তিনিই ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির হাল ধরবেন।
বালুশাহী: বেলাইচন্ডি বাজার, এটি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। ওই গ্রামীণ বাজারে তৈরি হয় মজার মিষ্টি বালুশাহী, যা স্থানীয়ভাবে বালুশাই মিষ্টি নামে পরিচিত। এই মিষ্টি খাওয়ার জন্য ওই বাজারের ঈমান আলীর দোকানে প্রতিদিন ভিড় থাকে। ক্রেতারা ১-২ কেজি করে বালুশাহী কিনে নিয়ে যায়। বালুশাহী তৈরির কারিগর পরেশ চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, 'বাপ-দাদা সবাই মিষ্টির কারিগর ছিলেন। ঈমান আলীর হোটেলে আমি ১০ বছর ধরে বালুশাহী মিষ্টিসহ অন্যান্য মিষ্টি তৈরি করছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে যে বালুশাহী তৈরি হয়, এই দোকানের বালুশাহী তেমন নয়। অন্যান্য জায়গায় বালুশাহীর রং সাদা। মিষ্টির গায়ে চিনির শিরার আবরণ থাকে। এখানকার তৈরি মিষ্টির রং চকলেট রঙের, স্বাদেও বৈচিত্র্যময়। ময়দা, গুঁড়া দুধ, সয়াবিন তেল, চিনি, জয়ফল, ছোট এলাচি, গ্লুকোজ বিস্কুট, লবণ, ডিম দিয়ে এই মিষ্টি বানানো হয়। ক্রেতারা বলেন অনেক মজার মিষ্টি। এ বালুশাহীর সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক, সেই আশা করি।'
বরফি: দুধের ছানা, চিনি আর খেজুর গুড়ের মিশ্রণ এবং এক বিশেষ মসলায় বিশেষভাবে তৈরি হয় এ বরফি জাতীয় সন্দেশ। বরফির আদি কারিগর ছিলেন উপেন মোদী। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার পৌরবাজার রয়েছে উপেনমোদীর আদি মিষ্টিঘর। এর খ্যাতি রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত থাকলেও এখন অনেকে আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরেও নিয়ে যাচ্ছে ডোমারের এই বরফি। ১৯৪৮ সালে দেশ ভাগের পর ডোমার উপজেলা বাজারে উপেন মোদী এই বরফি তৈরি করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। যার ঐতিহ্য এখন ধরে রেখেছেন উপেনমোদীর বংশধর। কথা বলে জানা যায়, ১৭ বছর আগে উপেন মোদী মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই ছেলে অমল রায়, সুভাষ রায় ও নাতী সুমন রায় তাঁদের বাপ-দাদার তৈরি এই বরফি ধরে রেখেছেন।
মনসুরী মিঠাই: বিয়েবাড়ি কিংবা মিলাদ মাহফিলে মনসুরীর কদর থাকে সবচেয়ে বেশি। নীলফামারীর সৈয়দপুরের হোটেল-রেস্তোরাঁয় প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয় মনসুরী মিঠাই। সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট রেলকলোনির বাসিন্দা মো. ভোলার দাবি, বংশপরস্পরায় মনসুরী মিঠাইয়ের কারিগর। তিনি ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বিহারি অধ্যুষিত জনপদ সৈয়দপুরে চলে আসেন। ভারতের বিহার রাজ্যের মুঙ্গের জেলার বাসিন্দা ছিলেন তিনি। সৈয়দপুরে তিনিই প্রথম মনসুরী মিঠাই বানিয়েছেন। পরে অন্যরা এই মিষ্টি বানাতে শুরু করেন।
এভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এই মিষ্টি। সৈয়দপুর শহরের দিলকুশা মিষ্টি ভাণ্ডার। এর মালিক কামরুদ্দিন এসেছিলেন বিহার থেকে। তিনি মারা যান ২০০৪ সালে। এখন এই দোকান চালান তাঁর একমাত্র ছেলে মো. কাওসার। তিনি বলেন, 'যত দূর জেনেছি, আফগানিস্তানের কাবুলের একজন ময়রার নাম ছিল মনসুর পাঠান। সৈয়দপুরে শতাধিক রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ মণ মনসুরী মিঠাই তৈরি হয়।'
বীরগঞ্জের রসগোল্লা: ২০০২ সালে মণি ঘোষ মারা গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর হাতে তৈরি সেই রসগোল্লা, যা ঐতিহ্য বহন করছে আজও। প্রয়াত মণি ঘোষ তরুণ বয়সে ১৯৫৪-৫৫ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে কাজের সন্ধানে দিনাজপুরের বীরগঞ্জে এসেছিলেন। তারও আগে বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) মিষ্টির কারিগর হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। মণি ঘোষের মামা বীরগঞ্জে হোটেল ব্যবসা করতেন। সেখানেই ছিল তাঁর কর্ম। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বীরগঞ্জের ডাক্তারখানা মাঠসংলগ্ন একটি দোকানে নিজেই মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেছিলেন।
বীরগঞ্জে বিয়ে করেন মণি ঘোষ। তার শ্যালক মনোরঞ্জন ঘোষকে সাথে নিয়ে চলে মিষ্টির ব্যবসা। সাধনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার আর আশা সুইটস। সবচেয়ে বেশি চাহিদা রসগোল্লার, যা এখন স্পঞ্জ মিষ্টি নামে পরিচিত। আশা সুইটসের বর্তমান স্বত্বাধিকারী মৃদুল কান্তি দেব জানান, 'মণি ঘোষই আমাদের মিষ্টির ঐতিহ্য দিয়ে গেছেন। তাই উত্তরের বিভিন্ন স্থানের বিশেষ ধরনের মিস্টিকে অনেকে বলেন ভিন্নস্বাদে খাবারে খাবারে হামার বাহের দেশ, বাহে।'
তাহমিন হক ববী/রাকিব