ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ১৯:০১, ৩ এপ্রিল ২০২৫

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন

চাঞ্চল্যকর শিশু আছিয়ার নির্মম নির্যাতন আর হত্যার বিক্ষুব্ধ পরিবেশে সারা বাংলা প্রতিবাদ মিছিলে মুখর হয়ে ওঠে। উত্তাল প্রতিরোধের দুঃসহ পরিস্থিতি দেশকে এক ঝড়ো হাওয়ায় মাতিয়ে দেয়। সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে এমন নৃশংস ব্যভিচারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওয়াজ তুললে প্রচলিত আইনটিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিছু সংশোধন আনে। সেখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঙ্গে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও সংযুক্ত করা হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি এমন বিচারিক প্রক্রিয়ায় সময়ও কম নির্দেশ থাকে। দ্রুততার সঙ্গ বিচারকার্য সম্পন্ন করার আদেশ আসে মাননীয় বিচারিক আদালত থেকে। সম্প্রতি আছিয়া ধর্ষণও মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্রে সবাই দৃষ্টিকটুভাবে আবারও উপলব্ধি করে কিছু জটিলতায় আইনটি দুর্বল হওয়ার কারণে ভুক্তভোগীরা সুবিচার পায় না বললেই চলে। একমাত্র আদুরি হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। সেটা তৎকালীন আইনবিদ সালমা আলীর সরাসরি আসামি পক্ষে বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার বদৌলতে। তার পরও কত নির্যাতন আর খুনের মামলা ধামাচাপা পড়ে যায় তাও এমন দুঃসহ ইতিবৃত্তের করুণ আখ্যান। ৮ বছরের শিশুকন্যা আছিয়া নৃশংস আঁচড়ে শুধু ক্ষতবিক্ষত নয় বরং অকালে অপ্রয়োজনে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া কেউই মানতেই পারছেন না। সঙ্গত কারণে আইনি কাঠামো নতুনভাবে সংস্করণের তুমুল প্রতিবাদ আর দাবির মুখে আইনটি আলাদা মাত্রা পাওয়া সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা যেমন প্রমাদ গুনছে একইভাবে ভুক্তভোগীরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কিছুটা জায়গা পেয়েছে। যে অমানবিক নৃশংসতা যুগ যুগান্তরের এক চলমান অত্যাচার, অবদমন, নিষ্ঠুরতাকে প্রবলভাবে হাজির করে সেখানে বিচার না হওয়ার ধৃষ্ঠতাও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় আনাই যায়। অপরাধীরা যখন মাথা উঁচু করে সমাজে দাপিয়ে বেড়ায় সেখানে অত্যাচারী পরিবার-পরিজন স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত ফেলতে পারে না। সোহাগী জাহান তনু সেই ২০১৬ সালে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পরকালের বাসিন্দা হয়েছে। কিন্তু ৯ বছর অতিক্রম করার পরও সেই বিচারিক প্রক্রিয়া আজ অবধি স্তব্ধতার তিমিরে। তনুর মায়ের অভিযোগ ৬ বার নাকি তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। প্রতিবার বদলের পর যোগাযোগ করাও ছিল আর এক রুদ্ধতার জাল। তেমনি বেষ্টনী অতিক্রম করা মোটেই সহজসাধ্য হয়নি। যার কারণে সেই মামলার কার্যক্রম দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে পড়াই শুধু নয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। উপস্থিত ঘটনায় সবাই নড়েচড়ে বসেন। কিন্তু পরিবেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে প্রত্যেকের মধ্যে গা ঝাড়া দেওয়ার বদভ্যাস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাও আমাদের চিরায়ত বিধিবদ্ধ সংস্কারের অন্যতম জটিলতর প্রক্রিয়া বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। ক্ষতবিক্ষত ভুক্তভোগী আর পরিবার কোন তিমির গহনে পড়ে যায় তা হিসেবের মধ্যেই আসে না। এভাবে কত নির্যাতন আর হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া ধামাচাপার অন্তরালে চলে যাচ্ছে তার হিসাবও বা কে রাখে?
এবার মাগুরার শিশু আছিয়ার ধর্ষণ আর হত্যাকাণ্ডে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম প্রক্রিয়ায় আইনটিকে সংস্কার করে সংশোধনী আনতে যথার্থ কার্যক্রমে এগিয়ে চলছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ডক্টর আসিফ নজরুল নতুন উদ্যমে আইনটির বিধি সংস্কারের ওপর তীক্ষè নজরদারি করে তাকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের বিচারিক কার্যক্রমে সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তাও আর ন্যূনতম সময়ের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সমাজের অপসংস্কার, পুরনো বিধি নাড়িয়ে দেওয়া অত সহজ ব্যাপার নয়, হরেক জটিলতার আবর্তে আর এক চলমান অবরুদ্ধতার বেষ্টনী যা ভেদ করতে কত সময়, দিন, মাস, বছর পার হয়ে যায় তাও দৃশ্যমান অসহ্য এক বাতাবরণ। আইন উপদেষ্টা নিজেই এই আইন সংস্কারের বিষাদঘন অনুভব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু চাঞ্চল্যকরই নয় হৃদয়বিদারক, বেদনাদায়ক শিশুকন্যা আছিয়ার মর্মান্তিক ধর্ষণ আর মৃত্যু সারাদেশকে কাঁপিয়ে দেয়। সেটাই আইনটি সংস্কারের মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে তিনি দুঃখের সঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেন আইনটির দুর্বলতা সম্পর্কে আইনজ্ঞরা বিশেষভাবে উপলব্ধিতে আনলেও কার্যক্ষেত্রে কোনো কিছুই করা হয়নি। তবে নতুন এ সংস্কার আইন তাড়াহুড়া করে কিছুই হচ্ছে না। বরং ঠান্ডা মাথায় যৌক্তিক বিচারে, আইনি বিধান সমুন্নত রেখেই করা হচ্ছে। তার আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বিশিষ্টজনের মতামত নিয়েই প্রচলিত আইনটির সংশোধনের প্রচেষ্টা চলছে। আইনের খসড়া তৈরিতে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের লিখিত মতামতও সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এ প্রচলিত আইনের বিধান পাল্টাতে যেয়ে কয়েকদিনের আলোচনা যথেষ্ট নয় বলে অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ধর্ষণকে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কন্যাশিশু থেকে নারী নির্যাতন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়াও নতুন সংশোধনীতে আলাদা মাত্রা পাবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় কার্যদিবসও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। ১৫ কার্যদিবস এবং বিচারসহ মামলার রায় ঘোষণার ৯০ কার্যদিবসে তা সম্পন্ন করার অধ্যাদেশ যুক্ত হয়েছে নতুন আইনে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা নিজেই একজন আইন বিশারদ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ ও যোগ্যতম বিবেচনায় শিক্ষকের মর্যাদায় কর্মজীবন সম্পন্ন করেছেন। তাই উদ্ভূত বর্তমান পরিস্থিতিতে আইন সংশোধনী আনা তার পক্ষেই হয়তো সম্ভব।

×