
শ্যামলীর শিশুমেলায় ঈদ উৎসবে মেতেছে ছোট-বড় সকলে
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ ...। সেই আনন্দযাত্রার শুরুটা হয়েছিল সোমবার। বিরামহীনভাবে বয়ে যাচ্ছে সেই উৎসব আমেজ। বুধবারের চিত্রটি জানান দিয়েছে, আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে এই রাশি রাশি আনন্দ-উল্লাস। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়সী থেকে বয়োবৃদ্ধÑসবার মনেই বইছে খুশির জোয়ার। সেই সূত্রে আনন্দ নগরীতে পরিণত হয়েছে যান ও জনজটের শহর ঢাকা। শহরের প্রান্তে প্রান্তে বিরাজ করছে প্রাণের প্রবাহ। উৎসবপ্রিয় বাঙালির কাছে এভাবেই ধরা দিয়েছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। তবে শিকড়সন্ধানী বাঙালিসত্তার কাছে ধর্মীয় এই উৎসবটি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। তখন আর থাকে না হিন্দু-মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের পরিচয়। উচ্চারিত হয় চিরায়ত সেই স্লোগান, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। উৎসবের সেতুবন্ধনে এক সুরে মেতে ওঠেন আনন্দের অবগাহনে। আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়ায় শুধুই নির্মল আনন্দের বারতা। সেই সুবাদে ঈদ উৎসব উদ্্যাপনে নগরবাসীর সরব পদচারণায় রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো পরিণত হয়েছে জনারণ্যে। অজস্র রঙে রঙিন হয়েছে উৎসব। ছড়িয়েছে রংমাখা মনের প্রাণের স্পন্দন। তাই তো ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হওয়া ঢাকায় বিরাজ করেছে সুখময় দৃশ্যকল্প।
ঈদ উৎসবকে ঘিরে চলছে শহরবাসীর ছোটাছুটি। সবুজে শোভিত রমনা পার্ক থেকে রূপালী পর্দার সিনেমা হল, মুঘল স্থাপনা লালবাগ কেল্লা থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, বিভিন্ন থিম পার্ক, রেস্তেরাঁসহ নানা স্থান ঘুরে কেটে যাচ্ছে সুন্দরতম সময়। এসব বিনোদন কেন্দ্রের মধ্যে শুধুমাত্র চিড়িয়াখানাতেই তিনদিনে ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছে। সেই সুবাদে ঈদ উৎসব উদ্্যাপনে নগরবাসীর সরব পদচারণায় রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো পরিণত হয়েছে জনারণ্যে। অজস্র্র রঙে রঙিন হয়েছে উৎসব। ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হওয়া ঢাকায় বিরাজ করেছে সুখময় দৃশ্যকল্প। সব মিলিয়ে বিনোদনপিপাসু মানুষের কাছে সোনায় সোহাগা হয়েছে এবার ঈদ উৎসব। তার মধ্যে এবার পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঈদ আনন্দে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন আমেজ। শহরবাসীর মন রাঙাতে সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে কিছু নতুন উদ্যোগ। সেই বাস্তবতায় চাঁদরাত থেকেই শহরে বিরাজ করছে উদ্যাপনের ঘনঘটা। ‘এলো খুশির ঈদ’ শিরোনামে রবিবার রাতে শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। অসংখ্য মানুষ যোগ দিয়েছিলেন আয়োজনটিতে। এ আয়োজনে গান শুনিয়েছেন শ্রোতার হৃদয়ে আলোড়ন তোলা জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ন্যান্সি। সুরের আশ্রয়ে উদ্দীপনা ছড়িয়েছে গানের দল বেঙ্গল সিম্ফনি। সঙ্গে ছিল জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আহমেদ নূর আমেরী পরিবেশিত কাওয়ালি ও মাইজভা-ারি গান। সুরের মূর্ছনা উপভোগের পাশাপাশি নগরের নারীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল মেহেদী কর্নার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মুঘল আমলের আদলে শহরে বেরিয়েছে ঈদ আনন্দ শোভাযাত্রা। এ আনন্দ মিছিলে অংশ নেন নগরের আনন্দপ্রিয় মানুষেরা। সোমবার সকালে আগারগাঁওয়ের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠের সামনে থেকে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়। ঈদের জামাত শেষ হতেই বেজে ওঠে ব্যান্ডপার্টির বাজনা। সেই বাজনায় ভেসে বেড়িয়েছে ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানের।
গত তিনদিন ধরে ফাঁকা শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছে বিনোদনপিপাসু নগরবাসী। চিরচেনা ব্যস্ত এই নগরে যেন নেমে এসেছে স্বস্তির অবকাশ। যান্ত্রিক কোলাহলের পরিবর্তে দেখা মিলেছে প্রশান্তিময় নীরবতা। তবে ঈদ আনন্দে নীরব শহরও সরব হয়েছে বিনোদনপ্রেমীদের মুখরতায়। তাই বলে সেটা কর্র্কশ গর্জনে বিরক্তির কারণ হয়নি। ট্রাফিক জ্যামহীন শহরে মনের সুখে ঘুরে বেরিয়েছে শহরবাসী। ফাঁকা হওয়া শহরে ক্রিং ক্রিং শব্দ তুুলে চলেছে রিক্সাভ্রমণ। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই পৌঁছানো গেছে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। তাই তো ঘোরাঘুরিটাও হয়েছে আরামদায়ক ও স্বস্তিকর। আনন্দের সন্ধানে অধিকাংশের গন্তব্য হয়েছে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, যমুনা ফিউচার পার্ক, পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা কিংবা আহসান মঞ্জিল।
ঢাকার বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উৎসব উদ্যাপনকারী সবচেয়ে বেশি কাছে টেনেছে প্রাণীরাজ্য চিড়িয়াখানা। সোমবার প্রথমদিন থেকেই এখানে ঢল নামে দর্শনার্থীর।
চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার জনকণ্ঠকে জানান, প্রথমদিন সোমবার দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭০ হাজারে। তৃতীয় দিন বুধবার এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার। এসব দর্শনার্থী মন ভরে উপভোগ করেছেন বাঘের গর্জন, বানরের চেঁচামেচি, বেবুনের ভেংচি কাটা, উটপাখির দৌড়াদৌড়ি, জলহস্তির ডুবসাঁতার, ময়ূরের নাচ, নানা জাতের সাপের ধীরগতিতে পথচলা আরও কত কী? সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে বানরের খাঁচার সামনে। কারণ অন্য প্রাণী চিড়িয়াখানায় আসার পর তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সামান্য হলেও হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বানরের বাদরামি এখানে বিন্দুমাত্র কমে না। তাই শিশু-কিশোররাও প্রবল উৎসাহে যোগ দেয় চঞ্চল এই প্রাণীটির বাদরামোর সঙ্গে। অনেকেই শিশু-কিশোরসহ পরিবারের বিভিন্ন বয়সের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে দিনভর চিড়িয়াখানার পশুপাখি দেখে সময় কাটিয়েছেন। অন্যদিকে যারা বৃক্ষের সান্নিধ্য পছন্দ করেন তারা সরাসরি ঢুঁ মেরেছেন চিড়িখানার পাশের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। নানা জাতের গাছ দেখার পাশাপাশি লতা-পতা কিংবা পুষ্পের সঙ্গে মিতালী গড়ে কাটিয়েছেন সময়।
ঈদের ছুটিতে শিশু-কিশোরদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রে। সেই ঘোরাঘুরির তালিকায় বাদ যায়নি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, হাতিরঝিল, চন্দ্রিমা উদ্যান, ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবর কিংবা পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেনসহ বিভিন্ন স্পট। এসব স্থানের মধ্যে দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি টেনেছি রাজধানীর ফুসফুসখ্যাত রমনা পার্ক। এই উদ্যানের সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে বর্ণিল পুষ্প-বৃক্ষের সঙ্গে কেটেছে কোলাহলমুক্ত কিছুটা সময়। এর বাইরে ঢাকার অদূরে ফ্যান্টাসি কিংডম বা নন্দন পার্কেও রকমারি রাইডে চড়ে উৎসব উদ্্যাপন করেছেন অনেকে।
ঘোরাঘুরির বাইরে ফাঁকা শহরে ক্রিং ক্রিং শব্দ তোলা রিক্সায় চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে নগরবাসী। ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি ঘরে ঘরে চলেছে অতিথিবান্ধব বাঙালির অতিথি আপ্যায়ন। মধুমিতা, স্টার সিনেপ্লেক্স, বলাকা কিংবা ব্লকবাস্টার সিনেমাতে নতুন আসা ঢাকাই ছবিটি দেখেও আনন্দ উপভোগ করেছেন অনেক সিনেমাপ্রেমী। অন্যদিকে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা, উত্তরা কিংবা বসুন্ধরাসংলগ্ন ৬০ ও ৩০০ ফুট এলাকার রেস্তরাঁগুলো দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট ছিল একইসঙ্গে ভোজনবিলাসী ও বিনোদনসন্ধানীদের আনাগোনায়। কেউ বা বিজ্ঞাপনের বিড়ম্বনা নিয়েই আনন্দ খুঁজেছেন চ্যানেলে চ্যানেলে বিনোদনমূলক নাটক, গান, সেলিব্রেটিদের আড্ডা কিংবা সংগীতানুষ্ঠান দেখে। তবে টিভি পর্দায় নির্মল আনন্দের সন্ধানকারীদের দারুণ আনন্দ দিয়েছে বিজ্ঞাপনের বিড়ম্বনাহীন বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি। টেলিভিশন, সিনেমা, সংগীতাঙ্গনসহ শিল্পের নানা ভুবনের খ্যাতিমান শিল্পীদের নিয়ে সাজানো আয়োজনটি হৃদয় রাঙিয়েছে দর্শকের।
ঈদের উৎসবে বড়দের সঙ্গে বাহারি রঙের পোশাকে সেজেছে শিশুরা। শুধু নতুন পোশাক পরলেই আনন্দ পূরণ হয় না। পোশাকের রঙের সঙ্গে মনের রঙ মেশাতে চাই বাঁধভাঙা বিনোদন। ছিল না বাবা-মার অনুশাসন আর বিধিনিষেধের কঠোরতা। তাই মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়েছে শিশুদের দল। শুধু আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো আর ঈদ সালামিতে তো মন ভরে না। চাই প্রকৃতির ছোঁয়া আর নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার। ঈদের ছুটিতে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেলেও সোনামনিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রসমূহ। চিড়িয়াখানার প্রাণীরাজ্য অবলোকন করে কিংবা শ্যামলীর শিশু মেলাসহ বিভিন্ন পার্কের রাইডে চড়ে মনের খোরাক মিটিয়েছে সোনামণিরা। বড়রা ঘুরেছে শিশুদের সঙ্গী হয়েছে। অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন অতিথি আপ্যায়নে। লোভনীয় খাবারের সঙ্গে চলেছে পরিবার-স্বজন বা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা। এভাবেই উৎসবের বর্ণময়তায় যেন এককালের তিলোত্তমা ঢাকা পরিণত হয়েছে আনন্দ নগরীতে।
ঈদ ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক আনন্দপিপাসুদের ভিড় জমেছিল হাতিরঝিলে। কেউ যুগলবন্দি হয়ে পরস্পরের হাত ধরে, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছে হাতিরঝিল। বন্ধুরাও জুটেছে দল বেঁধে। উপভোগ করেছে রাতের বেলায় জ্বলে ওঠা আলোকরশ্মি। চক্রাকার বাস ও ওয়াটার বাসে চেপে ঘুরে বেড়িয়েছে বৃক্ষ ও জলাশয়ে আবৃত হাতিরঝিলের চারপাশ।
শ্যামলীর সাবেক শিশু মেলা ও বর্তমানের ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডেও ঈদের তিনদিন দেখা গেছে শিশু-কিশোরদের হৈ-হুল্লোড়। এখানে অভিভাবকদের সঙ্গে আসা শিশুরা উপভোগ করেছে প্যারাট্রুপার, ভাইকিং বোট, রেসিং বাইকসহ বিভিন্ন রাইড। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল ঈদের আমেজ। ঈদের ছুটিতে প্রথমদিন থেকেই জনসমাগম ঘটে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা লালবাগ কেল্লায়। অনেকেই ভিড় জমিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী এ কেল্লায় আনন্দঘন কিছুটা সময় কাটাতে। জেনে নিয়েছেন ১৬১০ মুঘল স¤্র্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক স্থাপনার নানা বিষয়। শুধু লালবাগের কেল্লা নয়, পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেন, আহসান মঞ্জিলসহ বেড়ানোর জায়গাগুলোতে সপরিবারে এসেছিলেন অনেকে। এছাড়া পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লাকেন্দ্রিক অনানুষ্ঠানিক আয়োজনগুলো ছিল দারুণ সরব। বিশেষ করে সড়কের মোড়ে মোড়ে উচ্চস্বরের গান বাজিয়ে উল্লাস করেছে পাড়ার তরুণ ছেলেরা।
এদিকে আনন্দের সন্ধানে অনেকেই ছুটে গেছেন বিভিন্ন সিনেমা হলে। বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখা আর ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে জমে ওঠে দীর্ঘ আড্ডা। এছাড়াও সীমান্ত সম্ভার ও সনি স্কয়ারে স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লকবাস্টার সিনেমা, মধুমিতা, জোনাকী, বলাকাসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহগুলোতেও সিনেমাপ্রেমীদের কমতি ছিল না। ঈদকে রংময় করতে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন ছবি দেখে কাটিয়ে দিয়েছেন আনন্দময় সময়।