
সুনামগঞ্জে তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে ১০০ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে ওঠা শিমুল বাগান বাঁয়ে। ডানে মানিকগঞ্জ শিবালয়ের তেওতা জমিদারবাড়ীর
মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দেশের সবচেয়ে
বড় শিমুলবন
এ বছর মাঘের মাঝামাঝি সময়েই হাজারো শিমুল ফুলে ছেয়ে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান। ঋতুরাজ বসন্ত। বাগানে ফোটা হাজারো শিমুল ফুলের লাল আভা দেখে মনে হবে প্রকৃতিতে বসন্তকে বরণ করে নিতে রক্তিম সাজে সেজেছে পুরো শিমুলবন।
শিমুল বাগানের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিনী যাদুকাটা নদী। নদীটির উৎপত্তি বাংলাদেশ লাগোয়া ভারত সীমান্ত থেকে। বাগানের ওপারে বারেক টিলা ও এর ঠিক পরেই ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো মাথা উঁচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতিতে এক জায়গায় সৌন্দর্যের এত মেলবন্ধন দেখে ভ্রমণপিয়াসী মাত্রই বিমুগ্ধ হন।
প্রতি বছরের মতো এবারও বসন্তকে বরণ করে নিতে হাজারো দর্শনার্থীদের পদচারণায় মেতে উঠেছিল এ শিমুলবন। দলে দলে পর্যটকরা আসেন বসন্তের শিমুল রঙে মনকে রাঙিয়ে নিতে। কেউ আসবে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেউবা বন্ধু-বান্ধব বা প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। এ বছর পহেলা ফাল্গুন ছুটির দিন শুক্রবার হওয়ায় বাগানে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর ঢল নামে।
বলা হচ্ছিল সুনামগঞ্জে তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে ১০০ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগানের কথা। ২০০৩ সালে ৩ হাজারের বেশি শিমুলের চারা লাগিয়ে বাগানটি গড়ে তোলেন উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। বর্তমানে তাঁর ছেলেমেয়েরা এই বাগানটির দেখাশোনা করছে। কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বাগানটির সৌন্দর্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই শত শত পর্যটক বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসে এখানে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাগানে আগত দর্শনার্থীদের জন্য নানা সুযোগ সুবিধা গড়ে উঠেছে। বাগানের ভেতরে উন্নত ওয়াশরুম ও একটি ক্যান্টিন রয়েছে। ক্যান্টিনে নানা ফাস্টফুড জাতীয় খাবার মেলে। শিমুলবনে পর্যটকদের বসার জন্য নতুন করে বেঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাগানের বাইরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। কিছু বিনোদনের ব্যবস্থাও পাবেন, যেমন নাগরদোলা, ঘোড়ায় চড়ে বা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে শিমুলের ফুল দিয়ে তৈরি লাভ ফ্রেমে ঢুকে ছবি তোলা ইত্যাদি।
গত দুবছর ধরে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে কবিতা, নৃত্য ও গানের মধ্য দিয়ে শিমুল বাগানে বসন্তবরণ উৎসব করা হচ্ছে। তবে এ বছর পহেলা ফাল্গুনে পবিত্র শবেবরাত হওয়ার বসন্ত উৎসবের আয়োজন ছিল না। এমনটি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী।
জমিদারবাড়ীর পলাশগাছ ভরে
উঠেছে রঙিন ফুলে
ঋতু পরিক্রমায় শীতকাল শেষ। এরই মধ্যে পলাশ-শিমুলের শাখা ভরে উঠেছে রঙিন ফুলে। গাছে গাছে পাখির কলকাকলি। কোকিলের কুহু কুহু শব্দ ভাসছে বাতাসে। প্রকৃতিতে এসেছে নবপ্রাণ। তবে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে পলাশ-শিমুলের তেমন দেখা না মিললেও তেওতা জমিদারবাড়ীর দক্ষিণ আঙিনায় কালের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকা ফুলে ফুলে ভরা পলাশের গাছটি বসন্তের জানান দিচ্ছে। রঙিন ফুলের মুগ্ধতায় যেন সতেজতা ফিরে পেয়েছে প্রাচীন এ জমিদারবাড়ী।
জানা যায়, বসন্তকালে পলাশ ও শিমুল গাছ প্রকৃতিতে শুধু শোভাই বৃদ্ধি করে না। সৌন্দর্যের পাশাপাশি গাছের মালিকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হন। শিমুলের তুলা লেপ-তোষকসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। আর পলাশের রয়েছে একটি বিশেষ চাহিদা। বিদ্যাদেবী বলে খ্যাত ‘সরস্বতী’ পূজায় বাজারেও ওঠে এ ফুল। এক সময় এ উপজেলার গ্রামাঞ্চলে কিছু পলাশ গাছের দেখা মিললেও কালের বিবর্তনে এখন তা অনেকটাই হারাতে বসেছে।
শিবালয় উপজেলার স্থানীয়রা জানান, কিছু কিছু গ্রামে স্বল্প পরিমাণে শিমুল গাছের দেখা মিললেও পলাশের যেন দেখা দায়! বসন্ত ঋতুর আগমনে এরা জেগে ওঠে ফুলে-ফুলে। তবে কালের সাক্ষী হিসেবে পলাশ ফুলের একটি গাছ এখনো টিকে আছে উপজেলার ঐহিত্যবাহী তেওতা জমিদারবাড়ীর আঙিনায়।
সরজমিনে দেখা মিলে, গাছটি ভরে আছে শুধু ফুলে-ফুলে। গাছের নিচে মাটিতে কিছু ফুল বিছানা পেতেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য। জমিদারবাড়ীর দক্ষিণ আঙিনার পাশের পথে চলা উৎসুক অনেকের হাতে থাকা স্মার্টফোনে ধারণ হচ্ছে প্রকৃতির এ মনোরম দৃশ্য। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন পরিত্যক্ত ভিটা ও কাঁচা-পাকা রাস্তার ধারে অযত্ন-অবহেলায় কিছু শিমুল গাছের দেখা মিললেও পলাশের দেখা দায়।
মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি গোলাম সারোয়ার ছানু বলেন, দিন পঞ্জিকায় এখনো চলছে শীতকাল। এরই মধ্যে পলাশ-শিমুলের রঙিন উচ্ছ্বাসে প্রকৃতি সেজেছে নতুনরূপে। এ রকম মনোমুগ্ধকর পরিবেশ নয়ন জুড়িয়ে যায়। এমন প্রকৃতির ছোয়া পেয়ে সকলেই আনন্দিত। শীতের তীব্রতা কাটিয়ে বইছে ফাগুন হাওয়া, যা মানুষের মনে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় তেওতা একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, দুর্লভ হয়ে উঠেছে পলাশ ফুলের গাছ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পলাশ ফুলের সঙ্গে তেমন পরিচিত নন। ঋতুরাজ বসন্তকে মনে করে দেওয়ার জন্য একটি গাছই প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য যথেষ্ট। অন্তত বসন্তের জন্য হলেও বিভিন্ন স্থানে এ গাছের চারা লাগানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।
প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয় সাংবাদিক শাহজাহান বিশ্বাস বলেন, পরিকল্পিত আবাদ না হওয়ায় এ অঞ্চলে পলাশ-শিমুল গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। অযত্ন ও অবহেলায় বেড়ে ওঠা এখনো কিছু গাছ প্রকৃতিতে টিকে আছে। যার মধ্যে তেওতা জমিদারবাড়ীর আঙিনার পলাশ গাছটি। এটি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি। প্রতি বসন্তে আগুন রাঙা ফুল ফুটিয়ে গাছটি নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে আসছে।
মানিকগঞ্জ জেলা পরিবেশ রক্ষা কমিটির সহ-সভাপতি লক্ষ্মী চ্যাটার্জী বলেন, পলাশ-শিমুল গাছ উজাড় হওয়ায় প্রকৃতির রূপ ম্লান হচ্ছে। প্রকৃতির রূপ ও বসন্তের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব গাছ রোপণ করা প্রয়োজন রয়েছে।
জনকণ্ঠের সঙ্গে কথা হয় শিবালয় উপজেলা বন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। এ উপজেলার পলাশ ও শিমুল গাছের সংখ্যা জানতে চাইলে এর সঠিক সংখ্যা জানাতে ব্যর্থ হন তিনি। তবে তিনি এ জাতীয় গাছ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীতায় গুরুত্বারোপ করেন।
শহিদুল ইসলাম, শিবালয়, মানিকগঞ্জ
গাছে গাছে দোল খাচ্ছে
আমের মুকুল
উত্তর জনপদের নওগাঁর আত্রাই উপজেলার প্রতিটি এলাকার আমগাছে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে আমের মুকুল। শীত যেতে না যেতেই আমের মুকুল জানান দিচ্ছে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। বর্তমানে আমের মুকুলের ম-ম গন্ধে মুখরিত আত্রাই উপজেলার প্রতিটি এলাকা।
‘আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা / ফুল তুলিতে যাই, ফুলের মালা গলায় দিয়ে / মামার বাড়ি যাই। ঝড়ের দিনে মামার দেশে / আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে / রঙিন করি মুখ...। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘মামার বাড়ি কবিতার পঙ্ক্তিগুলো বাস্তব রূপ পেতে বাকি রয়েছে আর মাত্র কিছু দিন। তবে সুখের ঘ্রাণ বইতে শুরু করেছে। গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই মুকুলের পাগল করা ঘ্রাণ। বাতাসে মিশে সৃষ্টি করছে ম-ম গন্ধ। যে গন্ধ মানুষের মনকে বিমোহিত করে। পাশাপাশি মধুমাসের আগমনী বার্তা।
এ বছর কৃষিবিদ ও আম চাষিরা আশা করছেন বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমের ভালো ফলন হবে। আমচাষি ও বাগান মালিকরা বাগান পরিচর্যা করছেন। অবশ্য গাছে মুকুল আসার আগ থেকেই গাছে পরিচর্যা করছেন তারা। গাছে গাছে বালাইনাশক স্প্রে করার দৃশ্য চোখে পড়ছে।
উপজেলার প্রতিটি এলাকাজুড়ে এখন সর্বত্র গাছে গাছে শুধু আমের মুকুল আর মুকুল। মুকুলের ভারে নুয়ে পড়ার উপক্রম যেন প্রতিটি আমগাছ। সেই সুবাদে মৌমাছিরাও আসতে শুরু করেছে মধু আহরণে। রঙিন-বন ফুলের সমারোহে প্রকৃতি যেমন সেজেছে বর্ণিল সাজে, তেমনি নতুন সাজে যেন সেজেছে আত্রাই উপজেলার আমবাগানগুলো। আমের মুকুলে ভরপুর আর ঘ্রাণে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সর্বত্র জানান দিচ্ছে বসন্তের আগমনী বার্তা। শোভা ছড়াচ্ছে নিজস্ব মহিমায়। মুকুলে মুকুলে ভরে গেছে বাগানগুলো। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ না হলেও প্রাথমিকভাবে এ বছর ব্যক্তি উদ্যোগে উপজেলায় প্রায় ১২৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমবাগান গড়ে তোলা হয়েছে। বাগানে আম্রপালি, ফজলি, খিড়সা, মোহনা, ল্যাংড়া, রাজভোগও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়াও ছোট ছোট পরিত্যক্ত এবং বাড়ির আশপাশের জায়গাগুলোতে অনেক গাছ রয়েছে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু গাছে মুকুল আসতে শুরুও করেছে। আগামী ফাল্গুন মাসের ১ম সপ্তাহ নাগাদ মুকুলে ছেঁয়ে যাবে প্রতিটি আম গাছ। এ উপজেলার উৎপাদিত আম এলাকার চাহিদা পূরণের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এ ব্যাপারে উপজেলার বজ্রপুর গ্রামের সফল আম চাষি মো. মজিদ মণ্ডল জানান, পুরোপুরিভাবে এখনো সব গাছে মুকুল আসেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই সব গাছেই মুকুল আসবে। আমি এ আম থেকে অনেক টাকা আয় করেছি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আমচাষিরা জানান, এখনো সব গাছে মুকুল আসেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই সব গাছে মুকুল আসবে। প্রতি বছরই তারা আমগাছ থেকে অনেক টাকা আয় করে থাকেন। এ ছাড়াও অনেকেই আমের বাগান করেছেন তারাও প্রতি বছর আম থেকে অনেক টাকা আয় করছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদার বলেন, ইতোমধ্যে আম চাষিদের আমগাছে মুকুল আসার আগে এবং আমের গুটি হওয়ার পর নিয়মিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জৈব বালাইনাশক ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে আমসহ অন্যান্য ফল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমের ফলন ভালো হবে আশা করছেন তিনি।
বিশ্বজিৎ মনি, নওগাঁ
শিমুলের সঙ্গে সৌরভ ছড়াচ্ছে
আমের মুকুল
ঋতুচক্রের হিসাবে চলছে বসন্ত। উত্তরাঞ্চল থেকে বিদায় নিয়েছে বরফঝরা শীত। ফাগুনঝরা বাতাসে বেড়েছে দিনের তাপমাত্রা। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা উঠেছে ১৬ ডিগ্রিতে। আর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই করছে। স্থানীয়রা বলছেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় শীতের মাত্রা অনেক কমেছে। শুধু সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত একটা কাঁথা হলেই চলে। দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নেই আগের শীতের তীব্রতা। যার কারণে কাজকর্মে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে কাজ করলে শরীরে ঘাম ঝরছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এবার শীতকালও হারিয়েছে তার চিরাচরিত চরিত্র। এদিকে বসন্তের আবহে পলাশ ও শিমুল যেমন রাঙিয়েছে প্রকৃতি তেমনি গাছে উঁকি দিচ্ছে আমের মুকুল। মুকুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। রঙিন শিমুল ফুলের হাসি দেখা মিলছে মাঠেঘাটে। যা থেকে রক্ত লাল থেকে সাদা ধূসর হয়ে তৈরি হয় তুলা। পল্লী গায়ের পথের ধারে ঝরে পড়া শিমুলের ভারে গর্বিত হচ্ছে মাটির বুক।
উত্তরাঞ্চলের বিখ্যাত আম হাঁড়িভাঙ্গা। আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে ফলের বাগানগুলো। মুকুলের ম-ম গন্ধ আর মৌমাছির গুনগুন শব্দে সুভাষিত ও মুখরিত গোটা অঞ্চল। মুকুলের ভাঁজে ভাঁজে প্রোথিত রয়েছে।
কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। কয়েক দিন পর মুকুলের পেট চিরে বেরিয়ে আসবে আমের দানা। এ দানা শুধু দানাই নয় এ হলো কৃষকের আগামী দিনের স্বপ্ন। আগামীর সোনালি স্বপ্নে আম চাষিরা বিভোর হয়ে আছে।
বদরগঞ্জের কাঁচাবাড়ি নয়াপাড়া গ্রামের আম চাষি শাহাবুল ইসলাম জানান; আমার বাগানে পর্যাপ্ত মুকুল এসেছে। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তাহলে কয়েক লাখ টাকার আম বিক্রি করতে পারব। বৈরামপুর মিঞা পাড়াগ্রামের চাষি মাহাবুবুর জানান গত বছর এ বাগান থেকে ৩ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি। আশা করছি যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমের মুকুলের ক্ষতি না হয় তবে দ্বিগুণ টাকার আম বিক্রি করতে পারব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই আবহাওয়াগত ও জাতের কারণেই মূলত আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে। প্রতি বছরই আম গাছে আগাম মুকুল আসে। এবারও আসতে শুরু করেছে। ফালগুনের আমের মুকুল স্থায়ী হয় ও ফলন ভালো আসে।
বলতে গেলে দেশের উত্তরাঞ্চলের শীতপ্রধান এলাকায় প্রকৃতির ফালগুনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে সূর্য। দিনের সময় বেড়ে যাওয়ায় সূর্যের তাপ দীর্ঘসময় পাচ্ছে প্রকৃতি। ফলে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। চলতি মৌসুমে উত্তরজনপদের আট জেলায় শীতের তীব্রতা এবার জমজমাট ছিলনা। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতেই পারেনি এ অঞ্চলে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি উত্তরাঞ্চলে বজ্রসহ মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হবার পর থেকে শীতের বিদায় ঘণ্টা বাজে। নীলফামারী শহরের রিক্সাচালক রহিম মিয়া (৫০) বলছিলেন, শীত আপাতত বিদায়, ধীরে ধীরে গরম বাড়ছে। এখন রিক্সা চালাতে গিয়ে ঘাম ঝড়ছে। অন্যদিকে সেচনির্ভর বোরো আবাদের ব্যস্ত কৃষি শ্রমিক রুস্তম আলী (৪৫) জানালেন এইবার যে মারাত্মক গরম পড়বে তার আলামত টের পাচ্ছি। সেচের পানিতে কাজ করতে গিয়েও শরীরে ঘাম ঝরছে। মূলত পরিষ্কার আকাশ। শুষ্ক আবহাওয়ায় ফাগুন মাসের আগুন তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করলেও ট্রাকে মালামাল লোড ও আনলোড শ্রমিক মোবারক আলী (৪২)। সেচনির্ভর বোরো আবাদের পাশাপাশি ফসলি জমিতে ভুট্টা ও মরিচ খেতের শ্রমিকরা বলছেন রোদের তাপে এখন কাজ করাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। গরম এবার ভালোই হবে বলে জানালেন কায়িক শ্রমিক বশির মিয়া (৬৫)।
আবহাওয়া অফিস সূত্র বলছে বৃষ্টি শেষে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। ফলে উত্তরাঞ্চলে বাড়ছে তাপমাত্রা। বুধবার রংপুর বিভাগীয় শহরে সর্বনিম্ন ১৬.৫ ও সর্বোচ্চ ২৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। দিনাজপুরে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ২৯ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন ১৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নীলফামারীর সৈয়দপুরে সর্বোচ্চ ২৮.৮ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ১৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার হিমালয় পর্বতসংলগ্ন জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে নীলফামারীর তিস্তাপাড়ের ডিমলায় সর্বোচ্চ ২৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ফালগুনের তাপমাত্রায় হিমালয় পর্বতসংলগ্ন তেঁতুলিয়ার মানুষজন যেমন গেঞ্জি পরে কাজ করছে তেমনি তিস্তাপাড়ের মানুষজনও গরম কাপড় ফেলে দিয়েছে। অর্থাৎ ফালগুনের বেশি হচ্ছে তাপমাত্রা।
এতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিদায় নিয়েছে শীত। ফাগুন ঝরা বাতাসে বেড়েছে দিনের তাপমাত্রা। এদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ওঠানামায় বেড়েছে ঠান্ডা গরমের মিশ্রণে রোগব্যাধির প্রকোপ। ঘরে ঘরে ভাইরাস জ্বর দেখা দিয়েছে। হাকিমপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ (৬৫) জানালেন তার পরিবারের চার সদস্যের সকলেই ঠান্ডা গরমের কবলে জ্বরে আক্রান্ত। শুধু এই কৃষকই নয়- তিস্তাপাড়ের চরখড়িবাড়ি ও বাইশপুকুর চরের মানুষজন বলছেন ঘরে ঘরে গরম ঠান্ডার মিশ্রণে সকলে জ্বরে আক্রান্ত। সাথে সর্দি কাশিও রয়েছে। তারা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতেও বেড়েছে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের আচরণ থেকে কোনোভাবেই বেরোতে পারছে না বিশ্ব। উন্নত দেশগুলো থেকে নির্গত হওয়া গ্রিন হাউস গ্যাসের ক্ষতিকারক প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে ছোট দেশগুলো। জলবায়ুর এই বিরূপ আচরণের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এর ফলেই শীতের ভরা মৌসুমে শীত কমে গেছে বলেই জানান তারা। সূত্রমতে শীত বিদায় নিচ্ছে। একমোসটোরি রিভার বর্তমানে বাংলাদেশের ওপরে বিদ্যমান আছে। এটা দেশের উত্তরাঞ্চলে থাকলে শীতের প্রকোপটা একটু কম থাকে। এজন্যই এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহও হয়নি, আবার মাঝারি শৈত্যপ্রবাহও সেভাবে লক্ষ্য করা যায়নি।
প্রকৃতিতে জেগেছে
নবপ্রাণ
বিদায় নিয়েছে মাঘ মাস। দিনপঞ্জিতে বসন্ত চলছে। যাকে আমরা বাংলা মাসের ফালগুনের বাসন্তী হাওয়ায় গানের মতো ও পলাশ ও শিমুল... বলেই জানি। প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখের তৃষ্ণা মেটাতে এরই মধ্যে পলাশ-শিমুলের শাখা ভরে উঠতে শুরু করেছে। গাছে-গাছে আমের মুকুল উঁকি দিচ্ছে। সেখানে পাখির কলকাকলি। কোকিলের কুহু-কুহু শব্দ ভাসছে বাতাসে। বিভিন্ন নদ-নদী ও জলধারে কিচিরমিচির ডাক দিয়ে মেতে রয়েছে শীতের পরিযায়ী দল। এতেই উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতি জেগে উঠেছে নবপ্রাণ। যা শেষ মাঘে এসে ফালগুনী হাওয়ায় বসন্তের দরজায় কড়া নাড়ছে।
ফালগুনের হাতেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। বসন্তের আগমনে প্রকৃতিও নাড়া দেয় তরুণ হৃদয়কে। বসন্ত সমস্ত পূর্ব ধারণা এবং পার্থক্য পরিত্যাগ করার এবং নতুন কিছু সম্ভব এই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা বহন করে। বাংলার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে ফাগুনের মাতাল হাওয়ায় দোলা দিয়েছে। বসন্তের আগমন প্রকৃতিকে দেবে নতুন রূপ। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই নয়, আমাদের ঐতিহাসিক জাতীয় ভাষা আন্দোলনজুড়ে রক্তে লাল রঙের ফুল ফোটে শহীদদের স্মৃতিতেও। ১৯৫২ সালের আট ফালগুন বা একুশ পলাশ রঙের দিনগুলো যৌবনের দুঃসাহসী উচ্ছ্বাস এবং অসংযত আবেগের উত্তাল তরঙ্গকে একত্রিত করে। বাঙালিরা বসন্তের প্রথম দিনে পহেলা ফালগুন-বসন্ত উৎসব উদযাপন করে। বাংলায় বসন্ত উৎসব জীবনের একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে, যদিও এর উৎস একটি ঐতিহ্যবাহী অতীত যা অনেকের কাছেই অজানা। ১৫৮৫ সালে, মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন। তিনি ১৪টি নববর্ষ উদযাপনের প্রবর্তন করেছিলেন। তার মধ্যে বসন্ত উৎসব অন্যতম।
তাহমিন হক ববী, নীলফামারী