
ধানমন্ডি সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে ব্রোকেন হাউস শীর্ষক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম দেখছেন শিল্পী ফাহমিদা খাতুনসহ দর্শনার্থীরা
সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল এক চিত্রশিল্পী ফাহমিদা খাতুন। মূলত রং-তুলির আঁচড়ে রাঙিয়ে তোলেন ক্যানভাস। জল রং ও অ্যাক্রেলিক মাধ্যমের আশ্রয়ে সাজান আপন চিত্রপট। বৈচিত্র্যের অনুসন্ধানী এই চিত্রকর এবার ধাবিত হয়েছেন শিল্পের ভিন্ন পথে। সেই সুবাদে ক্যানভাসের পরিবর্তে সিরামিক মাধ্যমের আশ্রয়ে গড়েছেন ভাস্কর্য। চীনা মাটি, সাদা মাটি ও টেরাকোটা মাধ্যমের সম্মিলনে মেলে ধরেছেন বিবিধ বিষয়। তবে সেই বহুমুখী বিষয়ের মাঝে বিশেষভাবে উচ্চকিত হয়েছে মানবতার বারতা। গৃহহারা মানুষের বেদনার্ত অনুভবকে ধারণ করেছেন শিল্পে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামায় তছনছ হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের গৃহহীন জনগোষ্ঠীর যাতনাকে উন্মোচিত করেছেন শিল্পিত পথরেখায়। সে সব শিল্পকর্ম নিয়ে ধানমন্ডির সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে চলছে প্রদর্শনী। ফাহমিদার নবমতম এই একক শিল্পায়োজনের শিরোনাম ব্রোকেন হাউস বা ভাঙা ঘর।
প্রদর্শনালয়ের মেঝেতে রাখা টেবিলের ওপর এবং দেওয়ালে ঝুলছে শিল্পকর্মসমূহ। সেখানে সিরামিকে গড়া নানা আকৃতির পাঁচটি ভাঙা ঘরের দেখা মেলে। সেগুলোর কোনোটির দরজা কিংবা জানালা ভেঙে গেছে। ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে কোনো ঘরের ছাদ উড়ে গেছে। ভাঙা ঘরের এই সিরিজের সমান্তরালে প্রকৃতি, জীবন কিংবা ইতিহাসঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন ফাহমিদা খাতুন। তেমনই এক শিল্পকর্মের বিষয় হয়েছে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন। শুধু কি তাই, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনও ঠাঁই পেয়েছে এই শিল্পীর ভাস্কর্যে। এর বাইরে ফুল, লতা-পাতাসহ নিসর্গের নানা অনুষঙ্গ পরিণত হয়েছে শিল্পের বিষয়ে। রয়েছে সুদৃশ্য ফুলদানিসহ পাখি, কচ্ছপ, হাতিসহ নানা প্রাণীর অবয়বময় শিল্পকর্ম।
প্রদর্শনী শিল্পকর্মের প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ভাঙা বাড়ি সিরিজের সিরামিকের ভাস্কর্যের মাধ্যমে মূলত আমার অনুভূতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের কারণে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অজস্র মানুষ গৃহহারা হয়েছে। অনেক শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। যুদ্ধের ডামাডোলের শহর পর পর পরিণত হয়েছে জনশূন্য নগরীতে।
এমন বাস্তবতায় আমার প্রশ্ন জাগে, কেন এই যুদ্ধ? মানুষ কেন মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে কিংবা গৃহহারা করছে? একটু দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায়, বহু মানুষ হৃদয় ভাঙা মন নিয়ে বসবাস করছে তাদের ভাঙা বাড়িতে। কেন আমাদের সে সব ভাঙা ঘর দেখতে হয়? কার স্বার্থে চলছে এসব যুদ্ধ? অথচ ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন রং হলেও আমরা সবাই মানুষ।
এমন প্রেক্ষাপটে মানুষ মানুষের জন্য- কথাটি বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই আমার শিল্পকর্মের মাধ্যমে। সেই সূত্রে ভাঙা ঘর প্রদর্শনীটির মাধ্যমে একই সঙ্গে মানুষের জয়গান গাওয়ার পাশাপাশি মানবতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
সব মিলিয়ে ১০৫টি শিল্পকর্মে সেজেছে এই শিল্পায়োজন। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।