ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদে নীরব বিপ্লব

প্রকাশিত: ২০:৪৩, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদে নীরব বিপ্লব

এ রহমান মুকুল, পঞ্চগড় ॥ বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন পরিস্থিতিতেও গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র পাল্টে দিয়েছে চা আবাদ। খুলে দিয়েছে উন্নয়নের স্বর্ণদ্বার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দিক-নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে কুড়ি বছর আগে পঞ্চগড়ের সমতলভূমিতে শুরু হওয়া ক্ষুদ্রায়তনের চা আবাদ এখন উত্তরের কয়েকটি জেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে। এই কুড়ি বছরে শুধু পঞ্চগড়ের দৃশ্যপট পাল্টে যায়নি। পাশর্^বর্তী ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর জেলারও পাল্টে গেছে সার্বিক চিত্র। ইতোমধ্যে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কোটি কেজি ছাড়িয়ে গেছে। অল্প খরচে বেশি লাভ পাওয়ায় এ অঞ্চলে চা আবাদে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। ক্ষুদ্রায়তনের চা আবাদ করে উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার অনেকের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ জমিতে চা আবাদ করে অসংখ্য দিনমজুর পরিবারে ফিরে এসেছে সুখ-শান্তি। খড়ের ছাউনি আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ঘর হয়েছে পাকা বাড়ি। বৈদ্যুতিক আলো জ¦লছে, চলছে এলইডি টিভি। সন্তানরা পড়ছে স্কুল-কলেজে। অথচ ওই পরিবারগুলোকে একসময় অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় ২০০০ সালের এপ্রিলে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় প্রথম সমতলভূমিতে পরীক্ষামূলক চা আবাদ শুরু হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম স্থানীয় চাষী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের চা আবাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। প্রথম পর্যায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জমি কিনে চা আবাদ শুরু করেন। তাদের দেখাদেখি স্থানীয় চাষীরাও ক্ষুদ্রায়তনে চা আবাদ শুরু করায় পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় চা আবাদ। এরপর চা আবাদের পরিধি বাড়তে বাড়তে পাশর্^বর্তী ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় সম্প্রসারিত হয়। বেড়ে যায় চায়ের উৎপাদন। এর সঙ্গে চা প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ১৮টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে। পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় উৎপাদিত কাঁচা চা পাতা থেকে তৈরি চা উৎপাদন করা হচ্ছে। এই কারখানাগুলো চা-চাষীদের কাছ থেকে সবুজ চা-পাতা ক্রয় করে তা থেকে তৈরি চা উৎপাদন করেন। চাহিদা অনুযায়ী এই কাঁচা চা পাতার দাম মাঝে মধ্যে বাড়ে আবার কমেও যায়। উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত তৈরি চায়ের অকশন মার্কেট চট্টগ্রাম। সেখানে নিলামের মাধ্যমে চা বিক্রি করেন চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা মালিকরা। করোনা পরিস্থিতিতেও অকশন মার্কেট খোলা থাকায় কারখানা মালিকরাও যেমন চায়ের ভাল দাম পেয়েছেন তেমনি চা চাষীরাও তাদের কাঁচা চা পাতার ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের সূত্রমতে, ৫ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে। যা গতবছরের চেয়ে ৭ লাখ ১১ হাজার কেজি বেশি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে। পঞ্চগড়ের চাকে নিয়ে এটুআই কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ চা বোর্ড কর্তৃক ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’ নামে একটি এ্যাপস চালু করা হয়। এই এ্যাপসটির মাধ্যমে চা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ও পরামর্শ পাওয়ায় চা চাষীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। পঞ্চগড় পৌর এলাকার মসজিদ পাড়ার আতাউর রহমান বলেন, আমি ৭ একর জমিতে চা আবাদ করেছি। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চা পাতার উৎপাদন বেশি। এই ৭ একরে প্রতি রাউন্ডে চা পাতা পেয়েছি ১২ থেকে ১৫ হাজার কেজি। এভাবে ৬ রাউন্ড চা পাতা উত্তোলন করেছি। সর্বোচ্চ ২২.৫০ টাকা কেজি দরে চা পাতা বিক্রি করতে পেরেছি। যা গত মৌসুমে পেয়েছি অর্ধেক মূল্য। সদর উপজেলার মাগুরা বাহাদি পাড়া গ্রামের আজিজার রহমান ৭ একর জমিতে চা আবাদ করেছেন। তিনি এবার চা পাতার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় বেশ খুশি। একই এলাকার তরিকুল ইসলাম একসময় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তার ৯০ শতক জমিতে চা আবাদ করেছেন। এখন আর তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেননা। নিজের বাগানের পরিচর্যা আর চা পাতা তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আগে কাজ না করলে উপোস থাকতে হতো, এখন তিনবেলা পেট পুড়ে খান। বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিস সূত্র আরও জানায়, নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদের পরিধি বাড়তে শুরু করে। ওই বছরেই কাঁচা চা পাতা ১ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার কেজি উৎপাদন হয়। এ থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ২১ হাজার ৯২১ কেজি। এর আগের বছর উৎপাদিত ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ৪২৭ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১৪ লাখ ২০ হাজার ৪৬৭ কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় ১ কোটি ৭৪ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৩ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় ৩২ লাখ ৬ হাজার কেজি। ২০১৭ সালে কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় ২ কোটি ৫১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৯ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার কেজি উৎপাদন হয়। ২০১৮ সালে কাঁচা চা পাতা ৪ কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৯৮১ কেজি উৎপাদন হয় এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদিত হয় ৮৪ লাখ ৬৭ হাজার কেজি। ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ২১ হাজার ৬৫১ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় এবং তা থেকে ৯৫ লাখ ৯৯ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় এবং এ বছর উৎপাদিত ৫ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়। এ উপলক্ষে রবিবার সকালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের হলরুমে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, সমতলভূমিতে চা আবাদের জন্য পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জেলা। চা আবাদ সম্প্রসারণের জন্য চাষীদের বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করার ফলে পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদ ও চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র চাচাষীরা তাদের উৎপাদিত কাঁচা চা পাতার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় চা আবাদে উৎসাহী হচ্ছেন। ফলে নতুন নতুন চা আবাদিও বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোঃ জহিরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, কোভিড পরিস্থিতিতেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় দেশের সকল চা বাগানের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা চাষীদের দোরগোড়ায় প্রশিক্ষণ সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ক্যামেলিয়া খোলা স্কুলের মাধ্যমে চা আবাদ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান, সঠিক সময়ে চা চাষীদের ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণ, বাগানে কঠোরভাবে কোভিড প্রটোকল নিশ্চিতকরণ, চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, রেশন এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের ফলে সমতলের চা বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন বাগান থেকে ২০২০ সালের মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
×