
রমনা বটমূলে ছায়ানটের নববর্ষের প্রভাতী অনুষ্ঠানের মহড়া চলছে ছায়ানট ভবনের রমেশ চন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনায়তনে
শনিবার বসন্ত বিকেলে পৌঁছে যাই ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে। একতলা, দোতলা পেরিয়ে তৃতীয় তলায় পা ফেলতেই ভেসে আসে শ্রুতিমধুর সুরধ্ববনি। সেই সুরেলা শব্দের টানে প্রবেশ করি রমেশ চন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনায়তনে। সেথায় সুন্দরতম দৃশ্যের দেখা মেলে। অর্ধশত শিল্পী কয়েক সারিতে হাঁটু মুড়ে বসে ঠোঁট নাড়ছিলেন। শিশু-কিশোর শিল্পীরা কণ্ঠ মেলাচ্ছিলেন সমস্বরে। সকলে মিলে গাইছিলেন- আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে/আমার মুক্তি ধুলোয় ঘাসে ঘাসে/দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে/গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধ্বে ভাসে ...।
শিক্ষার্থী শিল্পীদের নিয়ে গানটির অনুশীলন করছিলেন সঙ্গীত শিক্ষক, কণ্ঠশিল্পী ও ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা। গানের পরিবেশনার ফাঁকে উচ্চারণসহ ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলো শুধরে দিচ্ছিলেন লিসা। অন্ধকার পেরিয়ে আলোর অভিমুখে পথযাত্রার ইঙ্গিতবহ এ গানটি অনুশীলনের হেতু ছায়ানটের নববর্ষ আবাহনের প্রস্তুতি। কারণ, দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন বাংলা সন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। আর বাংলা নববর্ষ উদ্্যাপনের সঙ্গে রয়েছে ছায়ানটের নিবিড় সম্পর্ক।
পহেলা বৈশাখে গ্রামীণ জীবনের অনুষঙ্গ নববর্ষ উদ্যাপনের প্রথাটি নগর জীবনে ছড়িয়ে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি। নববর্ষের আনন্দমাখা রংময়তায় নাগরিক মননের চেতনাকে বরাবরই শাণিত করেছে বাংলা নববর্ষ উদ্্যাপনের ছায়ানটের এই প্রভাতী আয়োজন। এবার সংকট পেরিয়ে সকলের মঙ্গল কামনায় ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ প্রতিপাদ্যে উদ্্যাপিত হবে ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজন।
বিগত বছরের ধারাবিহকতায় এবারও গান, পাঠ ও আবৃত্তি ও কথনে সজ্জিত হয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। পরিবেশিত হবে একক ও সম্মেলক গান। গাওয়া হবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামহ পঞ্চকবির গান। শুধু কি তাই! খ্যাতিমান থেকে উদীয়মান শিল্পীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হবে লোকগান, দেশাত্মবোধক গান থেকে গণসংগীত। বরাবরের মতো সকাল সোয়া ছয়টায় শুরু হবে অনুষ্ঠান।
এবার যন্ত্রসংগীতের পরিবর্তে সুপ্রিয়া দাশের কণ্ঠাশ্রিত রাগ আলাপের মাধ্যমে পরিবেশনা পর্বের সূচনা হবে। গোটা আয়োজনে সবচেয়ে বেশি থাকবে বৃন্দ পরিবেশনা। সম্মেলক সুরে গাওয়া হবে সলিল চৌধুরীর গান ‘ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না’। পরিবেশিত হবে রবি ঠাকুরের গান ‘মোরা সত্যের’ পরে মন আজি করিব সমর্পণ’। এ ছাড়া নববর্ষে পরিবেশিতব্য অন্য কয়েকটি সম্মেলক গানের শিরোনাম হলো ‘এই বাংলা রবি ঠাকুরের এই বাংলা কবি নজরুলের’, ‘আজ আইলো রে বছর ঘুরি’ ও ‘সকল কলুষতাসহ, জয় হোক তব জয়’।
দুই ঘণ্টা ব্যাপ্তির আয়োজনে একক সংগীত পরিবেশন করবেন খায়রুল আনাম শাকিল, চন্দনা মজুমদার, লাইসা আহমদ লিসা, আবুল কালাম আজাদ, সেঁজুতি বড়ুয়া, সুমন মজুমদার প্রমুখ। কবিতার দোলায়িত ছন্দে আবৃত্তি পরিবেশন করবেন বাচিকশিল্পী জয়ন্ত রায়। সকল পরিবেশনা শেষে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিসহ সামগ্রিকতাকে ধারণ করে নববর্ষের বাণী বা কথন উপস্থাপন করবেন ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী।
শতাধিক শিল্পী অংশ নেবেন ছায়ানটের এবারের নববর্ষের অনুষ্ঠানে। এর মধ্যে বেশিরভাগই শিশু-কিশোর শিল্পী। এই শিল্পীদের মধ্যে ছেলেরা পরনে থাকবে মেরুন আভার পাঞ্জাবি। মেয়েরা পরিধান করবেন মেরুন আভাময় পারের অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি।
রমনা বটমূলে বষবর্ষরণের প্রভাতী অনুষ্ঠানকে স্বার্থক করে তুলছে গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলছে মহড়া। শুরুর দিকে প্রতি শুক্র ও শনিবার মহড়া হলেও বর্তমানে নিত্যদিন চূড়ান্ত পর্বের মহড়া চলছে। এই মহড়ায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন রেজাউল করিম, সত্যম কুমার দেবনাথ, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি ও লাইসা আহমদ লিসা। বরাবরের মতো এবারও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে পরিবেশিতব্য গানের তালিকাটি চূড়ান্ত করেছেন সদ্য প্রয়াত ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন।
নববর্ষের প্রভাতী অনুষ্ঠানের সার্বিক বিষয়ে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা বলেন, বর্তমানে আমরা নানা রকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে সংকট রয়েছে। সেটাকে সংকট বিবেচনায় নিয়ে নতুনভাবে স্বদেশ গড়ার প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে এবারের আয়োজনে। সেই প্রেক্ষাপটে সকলের কামনায় আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে অনুষ্ঠান সাজিয়েছি।
নানামুখী পরিবেশনার ভেতর দিয়ে আমরা আলোর অভিমুখে ধাবিত হওয়ার কথা বলব। সমৃদ্ধির বার্তাবহ আগামীর পানে চলার কথা বলব। সকল কলুষতা দূর করে প্রগতির কথা বলব। ধর্ম-বর্ণ কিংবা জাতিগত পরিচয়ের বিভেদ পেরিয়ে আমরা সকলের মঙ্গল কামনা করব। পয়লা বৈশাখ যে সকলের উৎসবÑসে কথাটাই মনে করিয়ে দিতে চাই সবাইকে।
প্রসঙ্গত, শহর ঢাকায় বাঙালি জাতিসত্তার স্বকীয়তা প্রকাশে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনিন্দ্য উৎসবটির প্রচলন হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। বৈরী পরিস্থিতিতে পাক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রমনা বটমূলে হয়েছিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সংস্কৃতির শক্তিতে ভর করে বিজাতীয় শাসকদের বিরুদ্ধে ঘটেছিল আপন জাতিসত্তার বর্ণময় প্রকাশ। সেই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বছর এবং ২০২০ সালের করোনাকাল ছাড়া প্রতিবছর নিয়মিতভাবে হয়ে আসছে বর্ষবরণের এই প্রভাতী অনুষ্ঠানমালা।