
কুয়াকাটায় ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’ খ্যাত ফয়েজ মিয়ার ঐতিহ্যবাহী নারকেল বাগান সাগরের পানিতে
কুয়াকাটায় ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’ খ্যাত ফয়েজ মিয়ার ঐতিহ্যবাহী নারকেল বাগানটি এখন শুধু অতীত। দীর্ঘ নয়নাভিরাম সৈকতে কোল ঘেঁষে ৬০ সালে শুরু হওয়া বাগানটি দশ বছর আগেই বিলীন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সাগরের অব্যাহত ভাঙনে সৈকতের প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রস্থ গত কুড়ি বছরে বিলীন হয়ে গেছে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ফলে বাগানটির পাঁচ সহ¯্রাধিক নারকেল গাছের আছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি। এ বাগানটি ঘিরে কুয়াকাটায় আসা পর্যটক-দর্শনার্থীর ছিল আকাক্সিক্ষত দর্শন। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের কুয়াকাটার বর্ণিল দৃশ্য উপভোগের সঙ্গে নারিকেল বাগান দেখার শখ ছিল প্রত্যেকের। হাজার হাজার নারকেল গাছের সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বাগানের ম্যানেজারকে বলে কচি ডাবের পানির পিয়াস মেটানো ছিল আগতদের রুটিন কাজ।
গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে শেষ বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মনোলোভা ছবি তোলা ছিল তো প্রকৃতিপ্রেমী নর-নারীদের স্মৃতিময় অধ্যায়। বাগানের মধ্যে গাড়ি পার্কিং, পিকনিক করা, কাজু বাদাম, পেয়ারা খাওয়া। আরও কত কী। যেন কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা এখনকার নতুন প্রজন্মের কাছে এটি অবিশ^াস্য এক না পাওয়ার হতাশার কথা।
এক কথায় ফয়েজ মিয়ার নারকেল বাগান কুয়াকাটার মধ্যে ছিল আরেক কুয়াকাটার সৌন্দর্য। ফয়েজ মিয়া নেই। নেই তার ছেলে তারিক সাহেবও। বাগানটির নিয়ন্ত্রণও নেই তাদের কারও কাছে। সরকার এটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরও ১৭ বছর আগে, ২০০৭ সালের দিকে। এখনো কয়েকটা গাছ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জানা গেছে, ১৯৬০ সালে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা লতাচাপলী মৌজার ১৯৭ একর সরকারি খাস জমি ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে বাগানটি করেছিলেন ফয়েজ মিয়া। নাম দিয়েছিলেন ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’। নারিকেল গাছ ছাড়াও পেয়ারা, কাজু বাদাম, লেবু, কুল, গর্জন বাগানসহ বিভিন্ন জাতের ফলদ ও ওষধি গাছ ছিল বাগানটিতে। ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’ এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেখা তারিকের সঙ্গে মুঠো ফোনে কথা হয়েছিল সবশেষ ২০১৭ সালে। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘কুয়াকাটার বাগান। সে তো এখন ইতিহাস।
তারপর বলেছিলেন, ১৯৬০ সালে আমার শ্বশুর মরহুম ফয়েজ উদ্দিন মিয়া ১৯৭ একর খাস জমি সরকারের কাছ থেকে ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে শখের বাগানটি করেছিলেন। তখনকার সময় সরকারি কোষাগারে ৬৫ হাজার টাকা রাজস্ব দিয়েছেন বলে তার ভাষ্য। রেখা তারিক আরও বলেছিলেন, ‘২০০১ সাল থেকে বাগানের লিজ নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। এরপর থেকে বাগানটি হাত বদলের চেষ্টায় লিপ্ত হয় একটি প্রভাবশালী মহল। নিরুপায় হয়ে ২০০৭ সালে আমরা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করি।
মামলা চলমান অবস্থায় (২০০৯ সালে) আমার স্বামী আবু তারিক মারা যান। আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে মামলা পরিচালনা করি। সর্বশেষ হাইকোর্ট থেকে রায় আসে আমাদের পক্ষে। আমি বাগান বুঝে পাওয়ার জন্য রায়ের কপি নিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলান। তিনি বাগানের বুঝ না দিয়ে উল্টো আপিল করেন। আপীল মামলা তখনো চলমান ছিল, কিন্তু এখন বাগান তো আর নাই।’
কুয়াকাটা ফার্মস অ্যান্ড ফার্মসের জন্মলগ্ন থেকে ফয়েজ মিয়ার হাত ধরে কাজ করা ফার্মের রশিদ নামে খ্যাত আ. রশিদ মিয়া বলেন, ‘মোর জীবন তো এইজাগায়ই শ্যাষ অইয়া গ্যাছে।’ ১২ বছর বয়সে ফার্মে ফয়েজ মিয়ার লগে কামে আইছি। অ্যাহন বয়স ৭২ বছর। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সরকারের (২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আমলে বাগান দিয়া আমাগো বাইর কইর্যা দেয়।
বাগানডা এই শ্যাষ অইয়া গেল।’ কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমন্টে কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার রবিউল ইসলাম জানান, কুয়াকাটার উন্নয়নে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।