ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

নারায়ণগঞ্জে অষ্টমী স্নানোৎসবে পুণ্যার্থীদের ঢল

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ৫ এপ্রিল ২০২৫; আপডেট: ১৮:৫০, ৫ এপ্রিল ২০২৫

নারায়ণগঞ্জে অষ্টমী স্নানোৎসবে পুণ্যার্থীদের ঢল

ছবি: সংগৃহীত

  • ১০ লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর আগমন।
  • তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাঙ্গলবন্দের আদি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুইদিন ব্যাপি অষ্টমী স্নানোৎসবে লাখো পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা-৭ মিনিটে স্নানের লগ্ন শুরু হয়। লগ্ন শুরুর পরই তীর্থস্থানের ২০টি স্নান ঘাটে হাজার হাজার পূণ্যার্থীদের ঢল নামে।

শনিবার দিনভর লাখো পুণ্যার্থীদের আগমনে লাঙ্গলবন্দ এলাকায় সরগম হয়ে উঠে। আগত পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন লাঙ্গলবন্দের তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছেন। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় দেড় হাজার পুলিশ, ৪শ’ ৭১ আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। স্থাপন করা হয়েছে সেনা ক্যাম্প। র‌্যাব ছাড়াও সাদা পোশাকে রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য। তীর্থস্থানের তিন কিলোমিটার এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার।

যানজট নিরসনে ৬৪ জন ট্রাফিক পুলিশ ও নদীতে ৬৪ জন নৌপুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। এবার ১০ লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর আগমন ঘটেছে বলে ধারণা করেছেন আয়োজকরা। স্নানোৎসব শেষ হচ্ছে শনিবার মধ্যরাত ১২টা-৫১ মিনিট পর্যন্ত।

বন্দর থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম  বলেন, এ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবেই স্নানোৎসব চলেছে। কোথাও কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আশা করি ভালো ভাবেই স্নানোৎসব শেষ হবে।


হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য, আমার পাপ হরণ করো”। এই মন্ত্র পাঠ করে ফুল, বেলপাতা , ধান  দুর্বা, হরিতকি, ডাব, আমপাতা পিতৃকুলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন তীর্থ যাত্রীরা। এবার বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকা  থেকে কয়েক লাখ পূণ্যার্থী স্নানোৎসবে অংশ নিয়েছেন বলে লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দরা জানান।

শনিবার রাত ১২ টা ৫১ মিনিটে বিহীত পূজার মাধ্যমে শেষ হচ্ছে অষ্টমী স্নানোৎসব। আয়োজকরা বলেন, ত্রেতা যুগে পিতার আদেশ পালনের জন্য মাকে কুঠার দিয়ে হত্যা করেন পরশুরাম। মাতৃ হত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগে থাকে। কোনোভাবেই কুঠার হাত থেকে ছাড়াতে পারছিলেন না।

তখন অশোক বনে একটি জলাধারে ডুব দিলে তার পাপ মোচন হয়। পরশুরাম সেই জলাধার লাঙ্গল দিয়ে কেটে ব্রহ্মপুত্র নদে এনে মিলিয়ে দেন।  সেই থেকে নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। সেই থেকে মানুষ পাপ মোচনের আশায় এখানে স্নান করেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও লাঙ্গলবন্দ স্নান উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা শিখন সরকার শিপন বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের বন্দর এলাকায় ১৯টি ও সোনারগাঁও এলাকায় ১টি ঘাটসহ ২০টি ঘাটের মাধ্যমে এ স্নানোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার বিকেলে বলেন, আশা করি স্নানোৎসবে এবার দশ লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিপুর্ণভাবে স্নানোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।


স্নানোৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। শুক্রবার রাত ২টা-৭ মিনিট থেকে লাখো পূণ্যার্থী নলিত মোহন সাধু ঘাট, অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, মাকরী সাধু ঘাট, গান্ধী (শ্মশান) ঘাট, ভদ্রেশ্বরী কালী ঘাট, জয়কালী মন্দির ঘাট, রাজঘাট, রক্ষাকালী মন্দির ঘাট, পাষাণ কালী মন্দির ঘাট, প্রেমতলা ঘাট, মণি ঋষিপাড়া ঘাট, ব্রহ্ম মন্দির ঘাট, দক্ষিণেশ্বরী ঘাট, পঞ্চপান্ডব ঘাট ও পরেশ মহাত্মা আশ্রম ঘাটসহ ২০টি ঘাটে স্নানোৎসবে অংশ নেন।


শনিবার বেলা ১১টায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্নানোৎসবের ব্রহ্মপুত্র নদের ২০টি ঘাটেই পুণ্যার্থীদের প্রচুর ভিড় ছিল। তবে প্রতিবছরের ন্যায় রাজঘাটে পুণ্যার্থীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। পুণ্যার্থীরা এবারও শান্তিপুর্ণ পরিবেশে স্নানোৎসব সম্পন্ন করতে পেরে সন্তষ্টি প্রকাশ করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে স্ত্রীসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে লাঙ্গলবন্দে এসেছেন ফনি চন্দ্র দাস।  তিনি জানান, প্রতি বছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে পূণ্য লাভের আশায় তারা লাঙ্গলবন্দ স্নানে আসেন।  এখানে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। চট্টগ্রামের মীর সরাই থেকে পরিবারের সঙ্গে এসেছেন ষাটোর্ধ্ব বাসন্তী রানী সরকার। তিনি জানান, লাঙ্গলবন্দের আদি ব্রহ্মপুত্র নদে শুক্লা তিথিতে স্নান করলে ব্রহ্মার কৃপা লাভ করা যায়। তাই তিনি লাঙ্গলবন্দে এসেছেন। আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদি থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন কানাই লাল বর্মন।

তিনি বলেন, এবারও শান্তিপূর্ণভাবে স্নানোৎসব সম্পন্ন করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি। পাপ মোছনের আশায় প্রতিবছর লাঙ্গলবন্দে পরিবার নিয়ে স্নানোৎসব ছুটে আছি। গাজীপুরের টঙ্গীর দিয়াবাড়ি থেকে দিপালী চক্রবর্তী লাঙ্গলবন্দে পরিবার নিয়ে স্নান করতে এসেছেন। বিয়ের পর থেকেই তিনি এখানে স্নান করতে ছুটে আসেন। গত ৩০ বছর ধরে লাঙ্গলবন্দে স্নানোৎসব ছুটে আসেন শান্তি আশায়।  


বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান  জানান, ২০ টি স্নান ঘাটে সুষ্ঠুভাবে স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে নলকুল, একশ’ ৬০টি অস্থায়ী টয়লেটসহ স্নান ঘাটে  কাপড় পরিবর্তন কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ডুবুরি দল। বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, পূর্ণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় দেড় হাজার পুলিশ, ৪শ’ ৭১ আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। স্থাপন করা হয়েছে সেনা ক্যাম্প। র‌্যাব ছাড়াও সাদা পোশাকে রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য। তীর্থস্থানের তিন কিলোমিটার এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। যানজট নিরসনে ৬৪ জন ট্রাফিক পুলিশ ও নদীতে ৬৪ জন নৌপুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে ড্রোন ক্যামেরাও। 


এদিকে স্নান উপলক্ষে বন্দর উপজেলা বিএনপিসহ অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পূণ্যার্থীদের মাঝে খাবার সরবরাহ ও নানা সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সেবায় রয়েছে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক মেডিকেল টিম।


অপরদিকে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় লাঙ্গলবন্দ এলাকায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  এতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন- জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার, জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ এ এফ এম মশিউর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আলমগীর হুসাইন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল, বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা কমান্ড্যান্ট আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা কানিজ ফারজানা শান্তা, বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তরিকুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রবীর কুমার সাহা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি পরিতোষ কান্তি সাহা, মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উদযাপন পরিষদের সভাপতি সরোজ কুমার সাহা, সাধারণ সম্পাদক তাপস কর্মকার, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক শংকর কুমার দে, সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন, মহাতীর্থ লাঙ্গলবন স্নান উদযাপন ফ্রন্ট্রের আহবায়ক অপর্ণা রায়, সদস্য সচিব জয়কে রায় চৌধুরী বাপ্পি, উপদেষ্টা ননী গোপাল সাহা, বন্দর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম হিরন, সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশীদ লিটন, বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি শাহেনশাহ আহম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক রানা ও এড. রাজিব মন্ডলসহ লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব আয়োজনে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিবর্গসহ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ।

শহীদ

×