ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১

কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান এখন ইতিহাস

মেজবাহউদ্দিন মাননু, নিজস্ব সংবাদদাতা, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।

প্রকাশিত: ০৮:০৯, ৫ এপ্রিল ২০২৫

কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান এখন ইতিহাস

কুয়াকাটায় ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ খ্যাত ফয়েজ মিয়ার ঐতিহ্যবাহী নারিকেল বাগানটি এখন শুধু অতীত ইতিহাস। দীর্ঘ নয়নাভিরাম সৈকতে কোল ঘেঁষে ৬০ সালে শুরু হওয়া বাগানটির দশ বছর আগেই বিলীন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সাগরের অব্যাহত ভাঙনে সৈকতের প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রস্থ গত কুড়ি বছরে বিলীন হয়ে গেছে। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাগানটির পাঁচ সহস্রাধিক নারিকেল গাছের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি আছে। 

এ বাগানটি ঘিরে কুয়াকাটায় আসা পর্যটক-দর্শনার্থীদের আকাঙ্ক্ষিত দর্শন ছিল। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। সূর্যোদয়-সুর্যাস্তের কুয়াকাটার বর্ণিল দৃশ্য উপভোগের সাথে নারিকেল বাগান দেখার সখ ছিল প্রত্যেকের। হাজার হাজার নারিকেল গাছের সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। 

বাগানের ম্যানেজারকে বলে কচি ডাবের পানির পিয়াস মেটানো ছিল আগতদের রুটিন কাজ। গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে শেষ বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মনোরম ছবি তোলা ছিল তো প্রকৃতিপ্রেমী নর-নারীদের স্মৃতিময় অধ্যায়। বাগানের মধ্যে গাড়ি পার্কিং, পিকনিক করা, কাজু বাদাম, পেয়ারা খাওয়া-আরও কত কী। যেন কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা এখনকার নতুন প্রজন্মের কাছে এটি অবিশ্বাস্য এক না পাওয়ার হতাশার কথা।

এক কথায় ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান কুয়াকাটার মধ্যে ছিল আরেক কুয়াকাটার সৌন্দর্য। ফয়েজ মিয়া নেই। নেই তার ছেলে তারিক সাহেবও। বাগানটির নিয়ন্ত্রণও নেই তাঁদের কারও কাছে। সরকার এটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরো ১৮ বছর আগে, ২০০৭ সালের দিকে। এখনও কয়েকটা গাছ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাও বর্ষা মৌসুমে পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোতে অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রতিদিনকার দুইদফা উত্তাল ঢেউয়ে হানা দেয়। হয়তোবা উপড়ে নেবে। গত কুড়ি বছর প্রত্যেক বর্ষায় অস্বাভাবিক জোয়ারের তাণ্ডবে শুধু নারিকেল বাগান নয়, ঝাউ বাগান, ইকোপার্ক, কড়াই বাগান, শাল বাগান, জেলে পল্লী-সব সাগর গিলে খেয়েছে। বর্ষায় মৃত লাশের মতো পড়ে থাকে গাছগুলো।

জানা গেছে, ১৯৬০ সালে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা লতাচাপলী মৌজার ১৯৭ একর সরকারি খাস জমি ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে বাগানটি করেছিলেন ফয়েজ মিয়া। নাম দিয়েছিলেন “ফার্মস এন্ড ফার্মস”। নারিকেল গাছ ছাড়াও পেয়ারা, কাজু বাদাম, লেবু, কুল, গর্জন বাগানসহ বিভিন্ন জাতের ফলদ ও ওষধি গাছ ছিল বাগানটিতে। একা একা বাগানটির মধ্যে ঢুকলে ভয়ে গা ছম ছম করত। 

অন্যান্য গাছের চেয়ে সবচেয়ে বেশি প্রায় পাঁচ হাজার নারিকেল গাছ থাকায় বাগানটির পরিচিতি পায় নারিকেল বাগান হিসেবে। এক সময় ফলজ, ওষধিসহ বনজ গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাগানটি। বাগানের মধ্যে ছিল ফয়েজ মিয়ার একটি কটেজ। টিন শেডের টংঘর। বাগানে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যতে পরিণত হয়। বাগানটির মাঝখান দিয়ে একটি সরু পথ ছিল, যা হাঁটলে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পরে দেখা মিলত সাগর সৈকতের বেলাভূমি। 

রাতের বেলা বাগান ঘেঁষা টিনশেডের বাংলোতে অবস্থান করলে শেয়ালের ডাকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন আগতরা। পাখির কলতানে মুখরিত থাকত গোটা বাগানটি। বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোর কাছে এই বাগানের কথা শুনলে গল্পের মতো মনে হয়।

সকাল সন্ধ্যা কিংবা রাত,সবসময় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলরবে মুখরিত থাকত বাগানটি। গহীন বনে প্রবেশ করতে বন্য হিং¯্রপ্রাণী ও অজগরের ভয় ছিল। জোছনা রাতে গাছে গাছে বানর ও বাদুরের দাপাদাপি, আর লুকোচুরি চোখে পড়ত। কাগজে কলমে ফয়েজ মিয়ার বাগান ফাইল বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু নারিকেল বাগান খ্যাতি এখনও আছে। সাগরের উম্মাদনায় শেষ যেন এসব দৃশ্যাবলী।

‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেখা তারিকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছিল সবশেষ ২০১৭ সালে। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘কুয়াকাটার বাগান,সেটো এখন ইতিহাস।’ তারপর বলেছিলেন, ১৯৬০ সালে আমার শ্বশুর মরহুম ফয়েজ উদ্দিন মিয়া ১৯৭ একর খাস জমি সরকারের কাছ থেকে ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে সখের বাগানটি করেছিলেন। তখনকার সময় সরকারি কোষাগারে ৬৫ হাজার টাকা রাজস্ব দিয়েছেন বলে তার ভাষ্য।শ্বাপদ-সংকুল বনজঙ্গল সাফ করে বাগান উপযোগী করতে ৮০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। বিভিন্ন জাতের গাছ রোপণ করে বাগান করতে আরও লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

রেখা তারিকের দেওয়া তথ্যমতে, বরিশাল শহরের পাঁচ একর জমি বিক্রি করে বাগানটি করেছিলেন ফয়েজ উদ্দিন মিয়া। তিনি মারা গেলে তাঁর স্বামী আবু তারিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে রক্ষণা-বেক্ষণ করেছেন। তিনিও তখন ইহলোক ছেড়েছেন।
রেখা তারিক আরো বলেছিলেন, ‘২০০১ সাল থেকে বাগানের লিজ নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। এরপর থেকে বাগানটি হাত বদলের চেষ্টায় লিপ্ত হয় একটি প্রভাবশালী মহল। 
নিরুপায় হয়ে ২০০৭ সালে আমরা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করি। মামলা চলমান অবস্থায় (২০০৯ সালে) আমার স্বামী আবু তারিক মারা যান। আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে মামলা পরিচালনা করি। সর্বশেষ হাইকোর্ট থেকে রায় আসে আমাদের পক্ষে। আমি বাগান বুঝে পাওয়ার জন্য রায়ের কপি নিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বাগানের বুঝ না দিয়ে উল্টো আপিল করেন। আপিল মামলা তখনো চলমান ছিল, কিন্তু এখন বাগান তো আর নেই।’

মহিপুর ভূমি অফিসের তথ্যসূত্রে, মামলা চলমান অবস্থায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ কর্তৃপক্ষ। ১৯৬০ সালে প্রায় ২০০ একর জমি লিজ দেয়ার কোনো বিধান ছিল না। এজন্যই সরকারি জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেখা তারিক ভিন্নমত পোষণ করে তখন বলেছিলেন, ‘আমার শ্বশুর যথানিয়মে লিজ নিয়েছিলেন। আমরা অনেক কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছি। তাঁর বনায়ন করার মহতি উদ্যোগ ছিল।’

বর্তমানে বাগানটির যেন অনানুষ্ঠানিকভাবে যবনিকাপাতের অবস্থা হয়েছে। কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির জানান, মন্দিরের পাশে ৩-৪টি নারিকেল গাছ আছে। সব নিয়ে এক ডজনও নেই। সব শেষ। সাগরপার দিয়ে মেরিনড্রাইভ না করলে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাও দুই এক বছরে থাকবে না বলে অভিমত অনেকের। 

নারিকেল ছাড়া যেসব গাছ আছে, তাও বিক্ষুব্ধ সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে নিশ্চিহ্ন হতে চলছে। সব যেন লন্ডভন্ড করে দেয় বর্ষাকালের একেকটি অস্বাভাবিক জোয়ার। লাশের মতো উপড়ে ফেলে গাছগুলো। প্রতি বছরের কুয়াকাটা সৈকত ধ্বংসের তাণ্ডব এমনই। সেই সঙ্গে সাগরের উত্তালতা সৈকতের বেলা ভূমির পরিধি খাটো করে ফেলেছে। বাগান কিংবা আশপাশের ক্ষুদে দোকানিদের দোকানপাটেও হামলে পড়ছে উত্তাল ঢেউ। ভাসিয়ে নেয় দোকানপাটসহ মালামাল। সী-বিচে জোয়ারে থাকে না কোনো ওয়াকিং জোন। উপড়ে যাওয়া গাছগুলো আবার এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল কেটে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। 

কুয়াকাটার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শত্তরোর্ধ আলী আহম্মদ শেখ তার জীবদ্দশায় এ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করে জানান, পটুয়াখালীর বাউফল থেকে এসে ১৯৬৪ সালে বনজঙ্গল সাফ করে ফয়েজ মিয়া কুয়াকাটা সৈকতে বাগান সৃজন শুরু করেন। দেশি-বিদেশী অনেক ফলের গাছ লাগিয়ে ছিলেন। যা এখন নেই। বাগানে বন্যপ্রাণী বিশেষ করে বানর, শিয়াল, শুকর, সাপ, গুইসাপ, সজারু ছিল অনেক। ভয়ে মানুষ বাগানের মধ্যে যেতেন না। এখন তার কিছুই নেই।

কুয়াকাটা ফার্মস এন্ড ফার্মস’র জন্মলগ্ন থেকে ফয়েজ মিয়ার হাত ধরে কাজ করা ফার্মের রশিদ নামে খ্যাত আঃ রশিদ মিয়া বলেন, ‘মোর জীবন তো এইজাগায়ই শ্যাষ অইয়া গ্যাছে।’ ১২ বছর বয়সে ফার্মে ফয়েজ মিয়ার লগে কামে আইছি। এখন বয়স ৭২ বছর। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকারের (২০০৭ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকার) আমলে বাগান দিয়ে আমাগো বাইর কইরা দেয়। বাগানডা এই শ্যাষ অইয়া গেল।’


বর্তমানে নতুন প্রজন্ম কিংবা আগত পর্যটকরা বাগান তো দূর, সংরক্ষিত বাগান পর্যন্ত দেখার সুযোগ পায় না। কারণ সব যেন বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ভাটার সময় সৈকতের বেলাভূমে হাঁটা যায়। জোয়ারে নেই কোনো ওয়াকিং জোন। শুধুমাত্র দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার সৈকতের এক-দেড় কিলোমিটার এলাকায় প্রত্যেক বছর জিও টিউব ও জিও ব্যাগ দিয়ে ঢেউয়ের ঝাপটা ঠেকানোর চেষ্টা চলে। বাকি সৈকত সব অরক্ষিত থাকছে। বর্তমানে এই জিও টিউবের শ্যাওলায় আগত পর্যটকরা পা পিছলে প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন। এটি তাদের কাছে টেকসই নয় বলে দাবি।

বর্তমানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা কুয়াকাটার নেই নয়নাভিরাম প্রায় ২০০ একর জুড়ে ফার্মস এন্ড ফার্মস খ্যাত নারিকেল বাগানটি প্রবীণদের কাছে হারানো অতীত ছাড়া কিছুই নয়। কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি মোতালেব শরীফ জানান, কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নে সৈকত রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি প্রয়োজন। এছাড়া মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পাশাপাশি বনাঞ্চল যতটুকু আছে তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি তার দাবি।


কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল ইসলাম জানান, কুয়াকাটার উন্নয়নে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আফরোজা

×