ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

আজ তেলিয়াপাড়া দিবস: মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ১১ সেক্টর বিভাজনের ঐতিহাসিক ঘটনা

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ: 

প্রকাশিত: ১১:২৩, ৪ এপ্রিল ২০২৫; আপডেট: ১১:২৪, ৪ এপ্রিল ২০২৫

আজ তেলিয়াপাড়া দিবস: মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ১১ সেক্টর বিভাজনের ঐতিহাসিক ঘটনা

ঐতিহাসিক ৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক একটি দিন। ১৯৭১ সালের এ দিনে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় দেশকে স্বাধীন করার ঐতিহাসিক এক শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৭১ সালের ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া শপথে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ২৭ জন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

সে সময়ে মেজর খালেদ মোশারফ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আশ্রাফ আলীকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যাওয়ার মত একটি রাস্তা তৈরি করার নির্দেশ দেন। তিনি চা-বাগানের শ্রমিকদের দিয়ে জঙ্গল কেটে রাস্তা নির্মাণ করান। ২ এপ্রিল এমএজি ওসমানী প্রথম সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় পৌঁছান এবং ওইদিন বিকেলে ভারতীয় বিএসএফ এর পূর্বাঞ্চলীয় ব্যাটালিয়ন কমান্ডেন্ট পান্ডেকে তেলিয়াপাড়া ম্যানেজার বাংলোয় পাঠান।

৪ এপ্রিল সকালে একটি খোলা জিপ ড্রাইভারসহ আশ্রাফ আলীকে একজন সৈনিক দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়, সেখানকার সিদাই থানা থেকে এমএজি ওসমানীকে নিয়ে আসার জন্য। বিকেলে এসে মাগরিবের নামাজের পর ওসমানী চা-বাগানের ম্যানেজার বাংলোর দোতলায় কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকেই সমগ্র রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী।

বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেজর সি আর দত্ত, মেজর কেএম শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর সাফায়েত জামিল, লেঃ কর্নেল আব্দুর রব, এমএনএ লেঃ কর্নেল সালেহউদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, ব্রিগেডিয়ার ভিসি পান্ডে, ক্যাপ্টেন নাসিম, ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিন, ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভুইয়া, লেঃ সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, লেঃ হেলাল মোর্শেদ খান, লেঃ নাসিরউদ্দিন, লেঃ মাহবুব, লেঃ আনিস, লেঃ সেলিম, মোস্তফা আলী এমএনএ, মানিক চৌধুরী এমএনএ, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ এমপিএ, মৌলানা আসাদ আলী এমপিএসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতা।

তেলিয়াপাড়া ম্যানেজার বাংলোকে ৩নং সেক্টরের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বৈঠক শেষে ওসমানী ও রবের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের নকশা প্রণয়ন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ করানো হয়।শপথ বাক্য পাঠ করান এমএজি ওসমানী।

 ১নং সেক্টরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, পরে মেজর রফিকুল ইসলাম। ২নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশারফ পরে মেজর হায়দার। ৩নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কেএম শফিউল্লাহ পরে মেজর নুরুজামান। ৪নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর সি আর দত্ত। ৫নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। ৬নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার আবুল বাশার। ৭নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজী নুরুজামান। 

৮নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর ওসমান চৌধুরী পরে মেজর এমএ মনছুর। ৯নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আব্দুল জলিল এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন এমএ মঞ্জুর। ১০নং সেক্টর নৌবাহিনীর সৈনিকদের দিয়ে গঠন করা হয়। ১১নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু তাহের পরে ফ্লাইট লেঃ হামিদুল্লাহ।

মুক্তিবাহিনীকে ৩টি ব্রিগেডে ভাগ করে ৩ জনকে পরিচালনা করার দায়িত্ব দেন জেনারেল এমএজি ওসমানী। মেজর জিয়াউর রহমানের নাম অনুসারে জেড ফোর্স জিয়াউর রহমানের দায়িত্বে, মেজর শফিউল্লাহ নাম অনুসারে এস ফোর্স শফিউল্লাহ’র দায়িত্বে এবং মেজর খালেদ মোশারফের নাম অনুসারে কে ফোর্স খালেদ মোশারফের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মাধবপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম জানান- আমাদের গৌরবের স্থানটি সুরক্ষা ও আকর্ষণীয় করে তুলে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। স্মৃতিস্তম্ভের সংস্কার করাসহ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (পুরাতন) থেকে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে রাস্তা পাকাকরণের কাজ করা হয়েছে।

তেলিয়াপাড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষ জানান, ঐতিহাসিক এ দিনটিকে স্মরণ করতে প্রতি বছরের ৪ এপ্রিল স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় নানা এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে এসে স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন করে মুগ্ধ হচ্ছেন। চা-বাগানের ভেতরে স্মৃতিস্তম্ভটি অবস্থিত। এর পাশে রয়েছে একটি বিশাল লেক।

প্রসঙ্গত, তেলিয়াপাড়ার এই সম্মেলনকে স্মৃতিময় করে রাখতে মেহেরপুর জেলার ঐতিহাসিক মুজিবনগরে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রে ‘ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন’ শিরোনামে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এতে ওই বৈঠকে উপস্থিত সকলের ভাস্কর্য রয়েছে। 

ভাস্কর্যের পাশে স্থাপিত সাইনবোর্ডে যাদের নাম দেয়া হয়েছে তারা হলেন- এমএজি ওসমানী, ডিসি পান্ডে, কর্ণেল রেজা, মেজর নূরুজ্জামান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর রব, মেজর শাফায়াত জামিল, রকিব উদ্দিন, মঈনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর খালেদ মোশারফ ও মেজর জিয়াউর রহমান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা জানান, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে ঐতিহাসিক ওই স্থানটিতে জাদুঘর, রেস্ট হাউসসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বরাদ্দ এসেছিল। কিন্তু সে সময়ে অজ্ঞাত কারণে টাকা ফেরত চলে যায়। আমরা আশা করি সরকার ঐতিহাসিক এই স্থানটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ব্যবস্থা করবেন। আমরা প্রতি বছর ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া দিবস পালন করে থাকি। সেখানে জীবিত সকল সেক্টর কমান্ডারসহ বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সমাবেশ ঘটে। কিন্তু এ বছর নিমন্ত্রণ পাইনি। এতে হতাশ হয়েছি।

আফরোজা

×