ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

১৮০ ইয়ার্ডের মধ্যে সচল মাত্র ২২টি

নানা ষড়যন্ত্রের শিকার শিপ ব্রেকিং শিল্প

সংবাদদাতা, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৩:৫৬, ৩ এপ্রিল ২০২৫

নানা ষড়যন্ত্রের শিকার শিপ ব্রেকিং শিল্প

চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্পের একটি ইয়ার্ড

এলসি খুলতে ব্যাংকের কঠিন শর্ত, স্ক্র্যাপ জাহাজের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবেশ-মানবাধিকার সংগঠনের নামে শ্রমিকদের উস্কানি, বিদেশী স্ক্র্যাপ জাহাজ বিক্রিতে অনীহা প্রকাশসহ দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্রে চট্টগ্রামের সীতাকু- সমুদ্র উপকূলে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র শিপ ব্রেকিং শিল্পের ইয়ার্ডগুলো বন্ধ হওয়ার পথে।

কাঁচা লোহার খনিখ্যাত এই শিল্প বন্ধ হলে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে সরকার। পাশাপাশি এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দুই লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রি-সাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) সূত্রে জানা যায়, জাহাজ ভাঙা শিল্পের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সীতাকু- উপকূলজুড়েই গড়ে উঠেছে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। সীতাকু-ের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ২০ কিলোমিটার উপকূলে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সংখ্যা ১৮০টি হলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ২২টি। বিভিন্ন দেশের পরিত্যক্ত জাহাজ আমদানি করে ভিড়ানো হয় এখানে। পরে ভাঙা হয়।

আর এই জাহাজভাঙা শিল্পে হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনি খেটেই জীবন চালাচ্ছেন অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক। বর্তমানে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের ৫০ শতাংশ যোগানদাতা এই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো। ইস্পাত কারখানাগুলো শিপ ব্রেকিং লৌহজাত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাবনাময় ইস্পাত খাত পড়েছে সংকটে।
শিপ ইয়ার্ডের মালিকরা জানান, বিগত সরকারের আমলে নানা যোগসাজশে জাহাজভাঙা শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থানে থাকা সম্ভাবনাময় জাহাজভাঙা শিল্পটি পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার জন্য দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থাও পরিবেশের দোহাই দিয়ে বিদেশী প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন হয়েছে।

২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে এই জাহাজভাঙা শিল্প প্রথম স্থানে ছিল এবং এই শিল্প থেকে ১২শ’ থেকে ১৫শ’ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বাংলাদেশের নাম কোনো অবস্থানের মধ্যেই নেই।
তারা আরও জানান, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ শিপইয়ার্ড ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়ে দেউলিয়া, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। কারণ জাহাজ আমদানিতে এলসি করতে ব্যাংকের কঠিন শর্ত, বিশ্ব ব্যাংকের নানাভাবে চাপ সৃষ্টি, শ্রমিকদের উস্কানি, সীতাকু- থেকে শিপব্রেকিং ইয়ার্ড সরিয়ে ফেলাসহ নানাভাবে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পুরাতন জাহাজের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা জাহাজ আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে ছোট ব্যবসায়ীরা ঝরে পড়েছেন। ইয়ার্ডগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবসায়ীরা জানান, এই শিল্পকে ধ্বংস করতে গত কয়েকবছর ধরে একটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র উঠে পড়ে লেগেছে। এই চক্রান্তের কারণে গতবছর শিপ ব্রেকিং ব্যবসার কার্যক্রম কয়েক মাস বন্ধ ছিল। এ ঘটনার পর বিভিন্ন ধরনের কঠিন শর্ত পূরণ করে যখন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ ভাঙা শুরু হয়, তখন চক্রটি অন্য একটি ইস্যু নিয়ে আবারও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) সূত্রে জানা যায়, জাহাজ ভাঙা শিল্প ঘিরে সীতাকু-ের অর্থনৈতিক কর্মকা- খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। একটি জাহাজ থেকে হাজারো পণ্য পাওয়া যায়। ইস্পাত খাতের কাঁচামাল থেকে শুরু করে আলপিন সবই মেলে এই খাতে। শিল্পের কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক পণ্য ঘিরে এখানে অসংখ্য দোকান ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। রপ্তানিও হচ্ছে জাহাজভাঙা শিল্পের নানা পণ্য।

অবশ্য পরিবেশ দূষণসহ নানা কারণে এই খাতের রমরমা অবস্থা আর নেই। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শিল্পে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত সাতটি প্রতিষ্ঠান সবুজ শিল্প বা গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে সনদ পেয়েছে।
তারা আরও জানান, দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সীতাকু-ে ১৮০টি শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। সবগুলো ইয়ার্ড চালু থাকলে প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব পেত সরকার। প্রতিবছর সীতাকু-ে ২০০ থেকে ২৫০টি জাহাজ ভাঙা হয়। এই শিল্প থেকে প্রায় ৩০ লাখ টন স্টিল রিসাইক্লিং করা হয়। দেশের ৪৫০ স্টিল রি-রোলিং মিলের মধ্যে ৮০ ভাগই ছোট আকারের এবং তাদের কাঁচামালের জন্য এই শিল্পের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
জাহাজভাঙা শিল্প ব্যবসায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, দেশের একমাত্র জাহাজভাঙা শিল্প প্রতিনিয়ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে। অথচ এ শিল্প আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত। হংকং কনভেনশনের আলোকে শিপ ইয়ার্ডগুলো ক্রমান্বয়ে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

সাতটি শিপ ইয়ার্ড ইতোমধ্যে গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে সনদ লাভ করেছে। তারপরও এ শিল্পকে নিয়ে নানা অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। যার কারণে পুরোনো জাহাজ আমদানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমরা এ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অবসান চাই। 
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) কার্যকরী সদস্য ও এস এল স্টিলের চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন বলেন, অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এক লাখ লোক বেকার হয়ে পড়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক বর্তমানে মাত্র সাতটি শিপ ইয়ার্ডকে গ্রিন শিপ ইয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, একটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড করতে সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। সরকারিভাবে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দিলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন এবং এই শিল্পে বিকাশ ঘটবে।
সীতাকু-ের শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রবীণ উপদেষ্টা, সী-শোর ইন্টারন্যাশনালের মালিক আলহাজ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত এক দশকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে চলছে জাহাজ ভাঙা শিল্প। এর মধ্যে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের কার্যক্রম। কখনো অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে লোহার মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিপুল লোকসানের শিকার হয়েছেন মালিকরা। ব্যবসা বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন।

কিন্তু এলসির বিপরীতে ব্যাংক লোন পরিশোধ বন্ধ ছিল না। আয় বন্ধ কিন্তু ব্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন মালিকরা। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে ডলার সংকট। ডলার সংকট থাকায় কোনো এলসি খুলছে না ব্যাংক। এর ফলে কোনো মালিক বিগত ৫-৬ মাস ধরে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। 

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট এম এ তাহের বলেন, বর্তমানে যে দুঃসময় নেমে এসেছে তাতে আমরা টিকে থাকতে পারব কি না জানি না। ব্যাংক তো এলসি দিতে পারছে না। ব্যাংকে ডলার নেই। তারমধ্যে চলছে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র। এ রকম হলে জাহাজ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে ইয়ার্ডও বন্ধ হয়ে যাবে। এতে মালিক, শ্রমিক-কর্মচারী সবাই চরম ক্ষতির শিকার হবেন বলে তিনি মনে করছেন।

×