
রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় এক নারী সাংবাদিককে হেনস্তা
রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় এক নারী সাংবাদিককে হেনস্তার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোয়েব রহমান জিশানসহ (২৫) তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হচ্ছে-মো. রাইসুল ইসলাম (২১) ও মো. কাউসার হোসেন (২১)।
বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার র্যাব-৩ এর স্টাফ অফিসার (মিডিয়া) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সনদ বড়ুয়া সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সনদ বড়ুয়া জানান, বুধবার রাতে বনশ্রীতে নারী হেনস্তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বিষয়টি র্যাব-৩ এর নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। এ ছাড়া এ ঘটনায় রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহারে নাম থাকা ও অজ্ঞাতনামা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে র্যাব সদর দপ্তর, গোয়েন্দা শাখা এবং র্যাব-৩ এর একাধিক গোয়েন্দা ও অপারেশনাল টিম মাঠে নামে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি জানান, র্যাবের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার গভীর রাতে রামপুরা থানাধীন মেরাদিয়া এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত জিশানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা গ্রামে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রমনা থানাধীন বেইলি রোড এলাকা থেকে মো. রাইসুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে বরিশাল সদর উপজেলার চহটা গ্রামের বাসিন্দা।
এর পর শ্যামপুর থানাধীনগেন্ডারিয়া এলাকা থেকে মো. কাউসার হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেও বরিশাল সদর উপজেলার রাজ্জাকপুর গ্রামে বাসিন্দা। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের রামপুরা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মামলায় যা ছিল ॥ ভুক্তভোগী নারী সংবাদকর্মী সোয়েব রহমান ওরফে জিশানের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরও দুজনকে আসামি করে রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১০ ধারায় মামলা করেন। এই মামলায় তার ছোট ভাইকেও মারধরের অভিযোগ করেছেন তিনি। ওই ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বনশ্রী সি ব্লকে থাকেন।
ভুক্তভোগী একটি ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করেন। তিনি বলেন বুধবার রাত ৮টার দিকে ছোট ভাই রিশাদকে নিয়ে বনশ্রী ই-ব্লকের তিন নম্বর রোডের মুখে একটি জুসের দোকানে ছিলাম। এ সময় কয়েকজন স্থানীয় যুবক আমাকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে। আমার ভাই প্রতিবাদ করলে তারা প্রথমে তাকে মারধর করে। আমি বাধা দিতে গেলে তারা আমাকেও শশ্লীলতাহানি করে এবং কিল-ঘুষি মারে।
তিনি বলেন, আমরা নিজেদের বাসার সামনেই নিরাপদ নই। ছেলেগুলো এমনভাবে আচরণ করছিল যেন তারা যা করছে সেটাই তাদের অধিকার। আমার ভাই যখন প্রতিবাদ করল, তখন তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এমনকি তারা আমাকে হেনস্তা করার পরও অকপটে বলে, ‘হ্যাঁ, আমরা রেপ করেছি, কী করবে?
এ ব্যাপারে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ জানান, এ ঘটনায় এরই মধ্যে মামলা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিক বলেন, ঘটনার দিন রাতে অজ্ঞাতনামা এক লোক বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল দেখে আমি তার নিকট জানতে চাই আমাকে চেনে কি না? কেন তাকাচ্ছেন বারবার। এ কথা শুনে উনি উত্তেজিত হয়ে চিলল্লাচিলি শুরু করেন। এ কারণে আমি দোকান থেকে বের হয়ে আসি। আমি ও আমার ছোট ভাই ও বন্ধু দোকান থেকে বের হই।
বের হওয়ার পর ওই দোকানে অজ্ঞাতনামা দুজন প্রবেশ করে। খুব সম্ভবত ওই লোকের কাছ থেকেই তাকানোর বিষয়টি শুনে তারা আমার দিকে তাকালে কী হবে বলে টিজ করতে করতে দোকান থেকে বের হয়ে বিবাদী জিশানসহ অজ্ঞাতনামা দুজন আমার পথরোধ করে।
এটা দেখে আমার ছোট ভাই তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন তারা আমার ভাইকে থ্রেট দেওয়া শুরু করে এবং বলে যে, ‘বাসা কই, চল বাসায় যাই’। আমি তখন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বলতে থাকি যে, আমাকে টিজ করায় আমার ছোট ভাই সামনে আসছে, আপনারা সরেন, ওরা আরও উত্তেজিত হতে থাকে এবং আমার ভাইকে দুজন ফেলে মারতে শুরু করে।
তখন আমি আমার ভাইকে রক্ষার জন্য এগিয়ে গেলে পেছন থেকে বিবাদী জিশান ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা এসে আমাকে চুল ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বুকে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করে ও আমার শরীরে এলোপাথাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি দেয়।
অন্যদিকে আমার ভাইকে মারধর করতে দেখে আমার বন্ধু মাশফিক ভিডিও করতে গেলে তাকেও এলোপাথাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারে। এর পর বিবাদী জিশানসহ অজ্ঞাতনামা দুজন ব্যক্তি আমাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া শুরু করে এবং আরও বলতে থাকে যে, ‘রেপ করসি?’, ‘হ দেখ রেপ করসি’।
ওই সময় বিবাদী জিশান মোবাইল ফোনে ফোন করে আরও অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জন লোক নিয়ে আসে। সবাইকে শনাক্তও করা যায়নি, বিবাদী জিশানসহ অজ্ঞাতনামা দুজন ব্যক্তি আমাদের ফোন ফেলে দিচ্ছিল বারবার লাথি দিয়ে। বলছিল কার কাছে যাবি যা? একজন বলল, ‘আমি আনন্দ টিভির সাংবাদিক, যা কার কাছে বিচার চাওয়ার চেয়ে নে’।
তখন এক বয়স্ক লোক এসে ওদের সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করে বলতে থাকে যে, ‘আমি সমিতির নেতা, সমাধান করে দেব।’ তখন আমি ও আমার ছোট ভাই চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে চলে যাই।
ওই নারী সাংবাদিক আরও বলেন, আমি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে মামলা করেছি। আসামিদের শনাক্তে পুলিশকে ফুটেজ দিয়েছি। জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। তবে র্যাব প্রধান অভিযুক্তসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।