
ঈদের ছুটিতে রাজধানীর কাওরান বাজারে অলস সময় পার করছেন দুই ভ্যানচালক
এই শহরে প্রায়শই একটি কথা বহুলভাবে উচ্চারিত হয়। আর সেই কথাটি হচ্ছে, চিরচেনা ঢাকা। তো সেই চেনা ঢাকার রূপটি কেমন? উত্তরে বলা যায়, রুটি-রুজির তাগিদে রাজধানীকেন্দ্রিক বিপুল কর্মতৎপরতা। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও বিভিন্ন জেলার জনগোষ্ঠী বাস করে এই শহরে। সেই সুবাদে সড়কে বের হলেই দেখা মেলে অগণন মানুষ। ফুটপাত ধরে হাঁটা থেকে শুরু করে বাসসহ নানা গণপরিবহনে চেপে, মোটরসাইকেলে চড়ে চলে তাদের নিরন্তর ছুটে চলা। গন্তব্য বা কর্মস্থলে পৌঁছুনোর ঝক্কি-ঝামেলা।
সকাল থেকে রাত অবধি চোখে পড়ে এই দৃশ্য। আর নগরের এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে প্রায়শই যানজটে আক্রান্ত হয় রাজপথ। প্রয়োজনের চেয়ে পরিসর কম থাকায় চলতি পথে শরীরের সঙ্গে শরীর লেগে যাওয়ার মতো ঘটনা তো আছেই। হরহামেশাই এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিশাল বিশাল অট্টালিকার দাপটে ঢেকে যায় আকাশ। ফলে প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়াটাও যেন কঠিন হয়ে ওঠে এই নগরে। এর বাইরে সুযোগ বুঝে অপরাধীদের চুরি-ডাকাতি, ছিনতাইসহ বহুমুখী অপতৎপরতাও রয়েছে। সেই চিরচেনা ঢাকা এখন অনেকটাই অচেনা। বায়ান্ন বাজার তিপান্ন গলির শহরটা এখন অনেক বেশি স্বস্তির।
রাস্তায় চলাফেরা থেকে শুরু করে যে কোনো জায়গায় যাওয়াটাও খুব সহজ। কারণ, শহরজুড়ে বইছে উৎসবের আবহ। ঈদুল ফিতর উদ্যাপনের সূত্র ধরে কর্মচঞ্চল নগরীতে ভর করেছে ভিন্ন এক লাবণ্য। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে যাওয়া মানুষের কারণে ফাঁকা হওয়া ঢাকায় চলছে নির্বিঘেœ ঘুরে বেড়ানোর মৌসুম।
এমন বাস্তবতায় শহর নেই নিত্যদিনের কর্মচাঞ্চল্য। বিরাজ করছে আলসে ভাব। অলসতার সেই সুযোগে যান ও জনজটের শহর হয়ে উঠেছে স্বস্তি ও শান্তির। চোখে পড়ছে ঈদ উৎসব উদ্যাপনের সুন্দরতম দৃশ্যকল্প। মনের আনন্দে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চক্কর দিচ্ছে নগরবাসী। চলছে রিক্সাবিলাস। ক্রিং ক্রিং শব্দ তোলা ত্রিচক্র যানটিতে চড়ে ট্রাফিক সিগন্যালবিহীন পথে পথে ঘুরে খুঁজে নিচ্ছেন ভালোলাগার অনুভব।
উদ্যাপনের রেশ ধরে নগরবাসীর নিকটবর্তী কিংবা অদূরের বিনোদন কেন্দ্রগুলো এখন দারুণ সরব। তবে সেই সরবতার মাঝে ঘটেনি বিশৃঙ্খলা। কোথাও বা বিপুল জনসমাগম পরিলক্ষিত হচ্ছে। তেমনই এক বিনোদন কেন্দ্র মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা। প্রতিটি উৎসব-পার্বণেই সবচেয়ে বেশি মানুষের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পরিণত হয় পশু-পাখির কলরবে মুখরিত এই প্রাণীরাজ্য। সে কারণেই এবার ঈদের প্রথম থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত এখানে কয়েক লাখ দর্শনার্থীর সমামগম ঘটেছে।
দর্শনার্থীদের সেই সংখ্যাটি তিন লাখ ৯০ হাজার দর্শনার্থীর বলে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার। এর বাইরে চিড়িয়াখানার পার্শ্ববর্তী জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, শ্যামলীর শিশু মেলা, পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা, জলাশয় ও বৃক্ষশোভিত রমনা পার্ক ও রবীন্দ্র সরোবর, যমুনা ফিউচার পার্ক, সাভারের ফ্যান্টাসি কিংডম ও নন্দন পার্কসহ বিভিন্ন সিনেমা হল থেকে রেস্তোরাঁয় ঢুঁ দিয়ে নগরবাসী খুঁজে নিয়েছেন অপার আনন্দের উৎস।
সাধারণ দিনে ঢাকার কাওরানবাজারে স্বস্তিতে পা ফেলাটাও যেন বেজায় কঠিন। কিন্তু সেই প্রচ- কোলাহলময় এলাকাটি ঘিরে এখন নেমে এসেছে মানুষের শূন্যতা। থেমে গেছে দিন-রাত্রির প্রবল কর্মযজ্ঞ। থমকে গেছে ভ্যান, ট্রাকসহ নানা ধরনের যান চলাচল। বন্ধ রয়েছে সবগুলো দোকানের ঝাঁপ। তাই বৃহস্পতিবার মধ্য দুপুরে জটলাপূর্ণ স্থানটিতে সুনসান নীরবতার দেখা মেলে। সেথায় দুই ভ্যানচালককে মোবাইল ফোন হাতে অলস ভঙ্গিমায় বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। দুজনই শুয়েছিলেন ভ্যানের ওপর।
কথা হয় রফিক ও শাহীন নামের এই কর্মজীবীর সঙ্গে। আলাপচারিতায় তাদের একজন বলেন, মামা বাজার তো বন্ধ। তাই আমাগো কোনো কাজ নাই। এই সুযোগে একটু আরাম করতাছি। মোবাইল ফোন দেইখা বেকার সময় পার করতাছি। আগামী সপ্তাহ থেইকা বাজার চালু হইলে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ুম কাজে।
এবার ঈদের সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীরা টানা ৯ দিনের লম্বা ছুটি পেয়েছেন। আগামী ৬ এপ্রিল থেকে তারা কাজে যোগ দেবেন। একইভাবে বিভিন্ন রেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীরাও বড় ছুটি পেযেছেন। ফলে ঢাকার বেশিরভাগ মানুষই ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন। শনিবার থেকে ধীরে ধীরে শুরু হবে এসব মানুষদের ঢাকায় ফেরার পালা। ইতোমধ্যে কিছু মানুষ ফিরেছেনও। তবে বেশিরভাগই এখনো ফেরেননি। সকলের ফিরে আসার পুনরায় ঢাকায় বিরাজ করবে সেই চিরচেনা রূপ।