
দেশের সড়ক মহাসড়কে রাতের চলাচল অনেকটাই কমে গেছে
দেশের সড়ক মহাসড়কে রাতের চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। ভয়ংকর ডাকাত আর দুর্বৃত্তদের দাপটে সাধারণ মানুষ আতংকে। এখন একান্তই প্রয়োজন না থাকলে মানুষ দূরপাল্লার বাসে চলাচল এড়িয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, রাজারবাগ, সায়েদাবাদ ও উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসগুলোতে আগের তুলনায় যাত্রী হ্রাস পেয়েছে।
মালিক শ্রমিকরা বলেছেন, সড়ক মহাসড়কে যে হারে ডাকাতি, ছিনতাই ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তাতে মানুষ ভয় পেয়ে গেছে। এখন হয় তারা দিনে চলছে, নইলে ট্রেনে উঠছে। ভুক্তভোগীদের মতে, মহাসড়ক বা হাইওয়ে এখন নিরাপত্তাহীন। এখানে পুলিশের নজরদারি তেমন নেই। রাত যত গভীর হয়, মহাসড়কে ততই অপরাধীদের দাপট বাড়ে। গত সপ্তাহে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার পথে টাঙ্গাইলে একটি দূরপাল্লার বাসে ডাকাতি ও নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।
এ ঘটনায় জেলা পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ওই বাসটি একই এলাকা দিয়ে একাধিকবার চক্কর দিলেও টহলরত পুলিশ নজর দেয়নি। হাইওয়ে পুলিশ তখন টহল দিচ্ছিল না বলে অভিযোগও রয়েছে। ঘটনার পর মামলা নিতেও পুলিশের গড়িমসি নিয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই আবারও একই জেলায় ঘটেছে আরও দুটো ডাকাতি।
আবারও ডাকাতরা ঘাটাইলে সড়কে গজারি গাছ ফেলে শিক্ষাসফরে যাওয়ার চারটি বাসে ডাকতি করেছে। এ সময় প্রায় অর্ধ লাখ টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিয়েছে ডাকাতরা। মঙ্গলবার ভোরে উপজেলার সাগরদীঘি ইউনিয়নের সাগরদীঘি-ঘাটাইল সড়কের মালিরচালা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাইওয়ে পুলিশ নতুন করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ডিআইজি দেলোয়ার হোসেন বলেন, এখন সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে সারাদেশের মহাসড়ক। জেলা ও উপজেলা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে সক্রিয় রয়েছে টহল পুলিশ। বিশেষ করে প্রতিটি বাস ছাড়ার আগে টার্মিনালেই পুলিশের পক্ষ থেকে ভিডিও করা হচ্ছে যাত্রীদের ছবি ও মালামাল।
তল্লাশি করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হতে। এতে করে অপরাধীরাও কিছুটা সতর্ক হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে নতুন করে এগারোটি মাইক্রোবাস টহল দিচ্ছে সার্বক্ষণিক। ঢাকায় বসেই কুমিল্লা নোয়াখালী ফেনী ও চট্রগ্রামের এসপির সঙ্গে কথা বলছি। কার কোথায় ত্রুটি আছে সব জানছি।
বিশেষ করে সারাদেশের সঙ্গে এখন হাইওয়ে পুলিশ সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করছে। কোনো ধরনের অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক মামলা নিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যাতে অপরাধীরা দাপট দেখাতে না পারে।
জানা গেছে, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সোয়াইতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের চারটি বাস শিক্ষাসফরের উদ্দেশে নাটোরে যাচ্ছিল। বাসগুলো টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদীঘি-ঘাটাইল সড়কে পৌঁছলে ডাকাত দল সড়কে গজারি গাছ ফেলে পথ রোধ করে। পরে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতদল নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার করতে থাকলে এক শিক্ষার্থীর গলায় রাম দা ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুট করা হয়। ওই শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে সোয়াইতপুর উচ্চ বিদয়ালয়ের সহকারী শিক্ষক ওবায়দুল ইসলাম রুবেল জানান, ডাকাতদলের কয়েকজন প্রথমে সড়কে গাছ ফেলে। পরে গাড়ির ড্রাইভারকে অস্ত্রে মুখে জিম্মি করে গাড়িতে ঢুকে পড়ে। সে সময় গাড়িতে থাকা লোকজনের গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়।
তখন বাসের ছাত্র-ছাত্রীরা চিৎকার শুরু করলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আতঙ্কে যার কাছে যা ছিল সব দিয়ে দিয়েছে। ডাকাতি কালে প্রায় অর্ধ লাখ নগদ টাকা, ৮টি মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগেও গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে একই স্থানে ডাকাতির শিকার হন সাগরদীঘি এলাকার আজমত আলী নামের এক ব্যক্তি। ডাকাতরা তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে ২০ হাজার টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়।
বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, রাতে ওই সড়কে যাওয়ার পথে একদল ডাকাত পথরোধ করে। বাধা দিতে গেলে তারা হাত-পা বেঁধে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জঙ্গলে ফেলে চলে যায়। পরে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ও মোটরসাইকেল নিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. জলিল মিয়া বলেন, ‘সাগরদীঘি-ঘাটাইল সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই ডাকাতি হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। রাত হলেই এই সড়কটি আতঙ্কে পরিণত হয়।
প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ডাকাতরা বারবার একই জায়গায় হামলা চালাচ্ছে। আমরা রাতে চলাফেরা করতে ভয় পাই। এখানে একটা পুলিশ চেকপোস্ট স্থাপনের দাবি করেন তিনি।
ঢাকা কুমিল্লা নোয়াখালী চট্টগ্রাম রুটে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত খারাপ। ঢাকা সিরাজগঞ্জ হয়ে রাজশাহীসহ অন্যন্য জেলার সড়কগুলোতে একের পর এক ডাকাতি ছিনতাইয়ের পরও আইনশ্ঙ্খৃলা বাহিনীর টনক নড়েনি। টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও নারীর শ্লীলতাহানির রেশ না কাটতেই ফের রবিবার নওগাঁর পতœীতলা উপজেলায় সড়কে গাছ ফেলে যাত্রীবাহী বিআরিটিসি বাসে ডাকাতি হয়েছে।
ওই বাসের সুপারভাইজার রতন কুমার সাহা জানান, উপজেলার মানাষী ও করমজাইয়ের মাঝামাঝি এলাকার নজিপুর-সাপাহার সড়কে শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। যদিও এ বিষয়ে পতœীতলা থানার ওসি এনায়েতুর রহমান বলেন, রাস্তায় গাছ ফেলে বাসে ডাকাতির চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ায় দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। ঘটনার বর্ণনায় রতন কুমার সাহা বলছেন, আমাদের বাসটি রাজশাহী থেকে পোরশা উপজেলার নিতপুরের উদ্দেশে রাত পৌনে ৯টায় ছেড়ে যায়।
পথে একদল মুখোশধারী লোক রাস্তায় গাছ ফেলে তাদের বাস ও পেছনে থাকা একটি মাইক্রোবাস থামিয়ে দেয়। এরপর তারা জানালার গ্লাস ও দরজা ভেঙে বাসে প্রবেশ করে এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা, কয়েকটি মোবাইল ফোন ও নারী যাত্রীদের স্বর্ণালঙ্কারসহ তিন লাখের বেশি টাকার মালামাল লুট করে।
মাইক্রোবাসের চালককেও মারধর করে মালামাল লুটপাট করা হয়েছে। পরে মুখোশধারীরা গাড়ির গ্লাস ভেঙে দিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় একজন মোটরসাইকেল আরোহী ডাকাতদের কবল থেকে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে যান।
ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের নাম শুনলেই যাত্রীরা আঁতকে ওঠে। গত তিনমাস ধরেই এ রুটে প্রায় রাতেই দুর্বৃত্তরা বাস আটকে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির পণ্যবাহী গাড়ি থেকে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার মালামাল।
একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। দিনে-রাতে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন থামিয়ে ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েও চলছে ডাকাতি।
বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী, রাজধানীতে আসা ব্যবসায়ী, গাড়িচালক ও স্থানীয় তৈরি পোশাক শ্রমিকেরা বেশি ডাকাতি, ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঝামেলা এড়াতে মহাসড়কে ডাকাতির শিকার ব্যক্তিরা মামলা করতে চান না। কিছু মামলায় ডাকাত দলের সদস্যরা ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে আসামিরা আবার ডাকাতিতে জড়াচ্ছে।
তবে এই মহাসড়কে ডাকাতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাওয়া যায়নি। এই মহাসড়কে চলাচলকারী কুমিল্লা অঞ্চলের হালকা যানবাহনের চালকেরা নিজেদের ভার্চ্যুয়াল গ্রুপে শেয়ার করা তথ্যের বরাত দিয়ে বলছেন, গত ছয় মাসে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত মহাসড়কে অন্তত ১০০ ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে কোনো মামলা হয়নি।
অপর দিকে শেষ ছয় মাসে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় অন্তত ২৪টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ওই রুটে চলাচলকারী এক বাসচালক মুহিদ বলেন, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় চালকদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। ডাকাত দল যাত্রীদের সর্বস্ব নিয়ে পালানোর সময় কৌশলে চালকদেরই অপরাধী বানাচ্ছে। এতে চালকেরা বিনা অপরাধে আইনি ঝামেলার শিকার হচ্ছেন।
এ মহাসড়কে সম্পর্কে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ঘটনাই পুলিশের রেকর্ডে রয়েছে। গত ছয় মাসে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের তিনটি থানায় অন্তত ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রূপগঞ্জ থানায় ১৩টি, বন্দরে ৪টি ও আড়াইহাজারে ২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ছয় মাসে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় চারটি ছিনতাই মামলা হলেও সোনারগাঁ থানায় কোনো মামলা হয়নি। যদিও এ সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশে বেশ কিছু ডাকাতির ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। গত ৮ ডিসেম্বর সোনারগাঁর মেঘনা টোল প্লাজা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আরিফ সোহেলসহ নেতাদের বহনকারী একটি গাড়িতে ডাকাত দল হামলা করে।
এ সময় নেতাদের মারধর করে মালামাল লুটে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কজন চালক ও যাত্রী বলেন, মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে আসে। মামলা হয় আরও কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডাকাতির মামলা না নিয়ে চুরি কিংবা ছিনতাই মামলা নেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের শিকার যাত্রীরা ভয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়েন।
আদালত ও থানার হয়রানির ভয়ে তাঁরা মামলা এড়িয়ে যান। বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটলে মামলা হয়। এরপর পুলিশ জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেও দ্রুতই তারা জামিনে বের হয়ে আবার ডাকাতিতে জড়াচ্ছেন।
পুলিশও স্বীকার করেছে অনেক সময় গাড়ির চালক জড়িত থাকেন ডাকাতির সঙ্গে। যদিও ভুক্তভোগীদের দাবি, মহাসড়কে হাইওয়ে কিংবা থানা-পুলিশের কোনো নজরদারি নেই। বিশেষ করে রাত গভীর হলেই মহাসড়ক অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সম্প্রতি গভীর রাতে এই মহাসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার পন্থিছিলা এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় একজন নিহতও হন।
তার কদিন আগেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মেসার্স আকবর ট্রেড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টের একটি গাড়ি ৫০০ বস্তা প্লাস্টিক দানা নিয়ে গাজীপুর যাওয়ার পথে কুল্লিায় ছিনতাই হয়। পরদিন জেলা পুলিশের সহায়তায় মালপত্রসহ গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৭ নভেম্বর রাতে সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা থেকে কাভার্ড ভ্যান গতি রোধ করে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালপত্র লুট করা হয়।
এ ছাড়াও সম্প্রতি আবুল খায়ের স্টিল মিলের কাঁচামাল বন্দর থেকে কারখানায় যাওয়ার পথে মদনহাট এলাকা থেকে ছিনতাই হয়। যদিও পরে ট্রাকটি বায়েজিদ স্টিল মিলে পাওয়া যায়। কেডিএস শিল্প গ্রুপের একটি ট্রাক মালপত্রসহ হারিয়ে যায়, যদিও পরে সেটি উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগরের ইপিজেড এলাকায় একটি গাড়ি থেকে প্লাস্টিক দানা নিয়ে যায় চোরেরা। ২ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ১৫ টন ঢেউটিন নিয়ে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয় বিসমিল্লাহ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিকানাধীন একটি ট্রাক। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে দাউদকান্দি ব্রিজ পার হওয়ার পর ডাকাতেরা ট্রাকটি আটকে ট্রাকচালক শিমুলকে বেঁধে ফেলে।
পরে পণ্যসহ ট্রাকটি নিয়ে যায়। পরদিন গাড়িটি গাজী গ্রুপের টায়ার ফ্যাক্টরির সামনে খালি অবস্থায় পাওয়া যায়। ৬ অক্টোবর দুপুরে রপ্তানি পণ্য নিয়ে সীতাকুণ্ডের নেমশন ডিপোতে অবস্থান করলে কিছু দুষ্কৃতকারী তিনটি গাড়ির ভেতর থেকে ডকুমেন্ট চুরি করে নিয়ে যায়। পরে তিন গাড়ির চালককে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে ডকুমেন্টস ফেরত নেওয়ার জন্য ১৫ হাজার করে ৪৫ হাজার টাকা দিতে বলে।
১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য লোড করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় আরমান ট্রেডার্সের একটি গাড়ি। রাত সাড়ে ৯টার সময় চট্টগ্রামের মিরসরাই বাজার এলাকায় এলে কিছু দুষ্কৃতকারী এতে হামলা করে। দুষ্কৃতকারীরা চালকের মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নিয়ে গাড়িটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। চালক ৯৯৯-এ কল দিলে দুষ্কৃতকারীরা চালককে কুপিয়ে জখম করে এবং গাড়ির গ্লাস ভেঙে পালিয়ে যায়।
পণ্য পরিবহন মালিক ও মিকেরা জানিয়েছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে আসা কাভার্ড ভ্যানচালক মমতাজউদ্দিন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটা এখন সম্পূর্ণ অনিরাপদ মনে হয়। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কুমিল্লায় বেশি ছিনতাই হচ্ছে। কোনো কারণে গাড়ির গতি কমালে ছিনতাইকারীরা গাড়িতে উঠে চুরি করে। আবার অনেক সময় মহাসড়কের দুই পাশে আড়ালে লুকিয়ে থেকে সুযোগ বুঝে হামলা চালায়।
অনেক সময় পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের একজন নাজমুল। গত জানুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে মালবোঝাই কাভার্ড ভ্যান চালিয়ে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের বারইহাট এলাকায় মহাসড়কের এক পাশে গাড়ি থামিয়ে বিরতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় কাভার্ড ভ্যানের কিছু অংশ ভেঙে যায়।
পরে পুলিশের সহযোগিতা চাইতে গেলে টহলরত পুলিশ জানায়, এটি তাদের এখতিয়ারে নয়। পরদিন বারইহাট পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে তারা হাইওয়ে পুলিশের কাছে যেতে বলে। পরে হাইওয়ে পুলিশ জানায়, এলাকাটি তাদের অধীনে নয়। শেষ পর্যন্ত মামলা না করেই ফিরে যান নাজমুল। একই অবস্থার শিকার হন সিলেট মহানগরের বালাগঞ্জ এলাকায় গত ১৮ মার্চ একটি কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনায় পড়ে।
চালক মো. ইউসুফকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার পরিবারের অভিযোগ থানা ও হাইওয়ে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে শুধু ঘটনাস্থল কার এখতিয়ারে সেটা নিয়ে সিদ্বান্ত দিতে না পারায়।
এ ধরনের ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে ২ ফেব্রুয়ারি দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ বাজার এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন হাল্কা মোটরযানের চালকেরা। তাদের অভিযোগ-এলাকার প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের চালকদের হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকটি ভার্চ্যুয়াল গ্রুপ আছে। কোনো চালক ডাকাতের কবলে পড়লে তাৎক্ষণিক এসব গ্রুপে জানিয়ে থাকেন।
দেড় থেকে দুই মিনিটের মিশন ॥ ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে শেষ প্রান্ত ঢাকার নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জও নিরাপদ নয়। এখানে রাতে মহাসড়কগুলোতে গাড়ির চাপ বাড়লে সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তখন কখনো ধীরগতিতে আবার কখনো থেমে থেমে গাড়ি চলাচল করে। ওই সময় ডাকাতেরা সাধারণত ঢাকা থেকে আসা প্রবাসী যাত্রী বহন করতে পারে, সম্ভাব্য এমন প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসগুলোকে লক্ষ্য করে অস্ত্র নিয়ে দল বেঁধে হামলা চালায়। মুহূর্তেই তারা গাড়ির কাঁচ ভেঙে চালক ও যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সবকিছু লুটে নেয়।
চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও এশিয়ান বাইপাস মহাসড়কের রূপগঞ্জ থানার আওতাধীন তিনশ’ ফিট, কাঞ্চন সেতু, গোলাকান্দাইল, তারাব সেতু, সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে সানারপাড়, কাঁচপুর সেতুর পশ্চিম অংশ, বন্দরের মলিবাগ, মদনপুর ও কেওডালা, আড়াইহাজারের বান্টি এবং সোনারগাঁ থানার কাঁচপুর, দড়িকান্দি, টিপরদী, সাদীপুর, মোগড়াপাড়া, আষাড়িয়ারচর ও মেঘনা টোল প্লাজা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
এ রুটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েও ডাকাতি ঘটছে। আবু হানিফ নামের এক প্রবাসী জানান, গত ১৪ জানুয়ারি দুই বছর পর দুবাই থেকে দেশে ফেরেন। সঙ্গে ছিলেন তার প্রবাসী খালাত ভাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার কুটিচৌমুহনী এলাকার রাজীব ভূঁইয়া। যে উচ্ছ্বাস নিয়ে তারা দেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন, বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তা মিলিয়ে যায় ডাকাতের কবলে পড়ে।
বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কেওঢালা এলাকায় আসামাত্রই র্যাব পরিচয়ে একদল লোক তাদের বাসটি থামায়। র্যাবের পোশাক পরা ওই লোকগুলোর সঙ্গে ছিল ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ ও পিস্তল। একপর্যায়ে তারা হানিফ ও রাজীবকে বাস থেকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।
হাত-পা ও চোখ বেঁধে মারধর করে প্রায় চার ঘণ্টা বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে ডেমরার একটি নির্জন স্থানে তাদের গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে লুটে নেওয়া হয় নগদ টাকা, বিদেশ থেকে আনা মালামাল, মোবাইল ফোন, পাসপোর্টসহ সবকিছুই। যার মোট আর্থিক মূল্য ২১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এ ঘটনায় মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু লুট হওয়া মালামাল ফেরত পাননি। একই অবস্থার শিকার হন প্রবাসী আবদুল কুদ্দুস। তিনি জানান, তিনি সেনানিবাস এলাকার একটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে শহরের দিকে যাচ্ছিলেন।
পথে তাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নেয় ডাকাত দল। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে মারধর করে নগদ সাড়ে ছয় লাখ টাকাসহ প্রায় দশ লাখ টাকার বিভিন্ন মালামাল লুট করে তাঁকে মহাসড়কের আলেখারচর এলাকায় ফেলে যায়। ঘটনার পর কয়েকবার চেষ্টা করেও থানায় মামলা করতে পারেননি তারা। এর মধ্যে আবদুল কুদ্দুস ইতালি চলে গেছেন।
যা বলছে হাইওয়ে পুলিশ ॥ এসব বিষয়ে কথা বলতে সোমবার উত্তরার হাইওয়ে পুলিশের অফিসে গেলে হাইওয়ে পুিলশের ডিআইজি দেলোয়ার হোসেন কিছুটা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই বলেন, সারাদেশের তিন হাজার কিলোমিটার হাইওয়েতে এক দুটো ডাকাতির ঘটনা কি খুব বেশি? উন্নত দেশেও তো এর চেয়ে বেশি ডাকাতি ও ছিনতাই হয়ে থাকে।
তারপরেও আমরা বলতে চাই, ডাকাতি ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছি। আমরা এখন এ জাতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টিম ওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছি।বিশেষ করে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে আমরা প্রতিনিয়ত মনিটর করছি। নতুন করে এগারোটি মাইক্রোবাস টহল দিচ্ছে সার্বক্ষণিক। ঢাকায় বসেই কুমিল্লা নোয়াখালী ফেনী ও চট্টগ্রামের এসপির সঙ্গে কথা বলছি। কার কোথায় ত্রুটি আছে সব জানছি।
গত কদিন আগে ভৈরবেও একটি সিএনজি ছিনতাইকারীদের মুখে পড়ে। আমি তাৎক্ষণিক কিশোরগঞ্জের এসপিকে ফোন করে বলছি যাতে এ ঘটনায় ডাকাতির মামলা নেওয়া হয়। একইভাবে টাঙ্গাইলের ঘটনার পর গাবতলী চন্দ্রা হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত প্রত্যেকটা ফাঁড়ির ইনচার্জের সঙ্গে কথা বলে দিক নির্দেশনা দিয়েছি। যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃুত্তি না ঘটে।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, সারাদেশের ২১ হাজার ৮৮৮ কিলোমিটার মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশ। গাজীপুরের টঙ্গী থেকে জৈনাবাজার পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার মহাসড়কের টঙ্গী থেকে ভোগড়া অংশ হাইওয়ে পুলিশের অধীনে। ভোগড়া থেকে রাজেন্দ্রপুর পর্যন্ত গাজীপুর মহানগর পুলিশের অধীনে।
আর রাজেন্দ্রপুর থেকে জৈনাবাজার পর্যন্ত জেলা পুলিশের অধীনে। এ ছাড়া আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে দুর্ঘটনা, চোরাচালান ও মাদক উদ্ধারের দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের। মাত্র ২ হাজার ৮৭৪ জন সদস্য নিয়েই হাইওয়ে পুলিশকে এই দায়িত্ব সামলাতে হয়।২২ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ হাইওয়ে পুলিশের অধীনে হলে এ ক্ষেত্রে জনবল, অবকাঠামোগত বিষয়গুলো দিতে হবে।
আমাদের ইউনিটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ইতিমধ্যে ৩ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের জন্যই ২টি রিজিওন, ১টি ট্রেনিং সেন্টার, ৩০টি সার্কেল ও ৬৮টি থানার জন্য ৬ হাজার জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা চাচ্ছি জরুরি ভিত্তিতে কিছু জনবল। তাহলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সহায়ক হবে।