বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু জনপদ রয়েছে যেগুলো এক সময় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বে উজ্জ্বল ছিল। অথচ সময়ের প্রবাহে আজ প্রায় বিস্মৃত। তেমনই একটি ঐতিহাসিক জনপদের নাম ভূষণা। সুলতানী আমলে এটি ছিল বাংলার সতেরোটি টাকশাল শহরের অন্যতম। অর্থাৎ এখানে মুদ্রা তৈরি হতো, যা সেই সময়ের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের একটি বড় নিদর্শন। বর্তমানে অঞ্চলটি মাগুরা শহরের অল্প কয়েক কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত হলেও এক সময় এটি বৃহত্তর যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ইতিহাসের নানা বাঁকে এর অবস্থান ও পরিচয়ে পরিবর্তন এসেছে।
মুঘল আমলে বাংলার রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠনের সময় নবাব মুর্শিদকুলী খান ভূষণাকে একটি চাকলায় পরিণত করেন। চাকলা ছিল মূলত একটি বৃহৎ রাজস্ব এলাকা। ভূষণা চাকলার আওতায় বর্তমান ফরিদপুর জেলার বিস্তীর্ণ অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ফরিদপুর জেলার বাকি অংশ সে সময় জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা), মুর্শিদাবাদ, যশোর এবং ঘোড়াঘাট চাকলার অন্তর্গত ছিল। ফলে আঠারো শতকে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও পরিবর্তনের কারণে ভূষণার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
ভূষণার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার রাজনৈতিক সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধ আন্দোলন। বাংলার পূর্বাঞ্চলে মুঘল আগ্রাসন প্রতিহতকারী এই শক্তিশালী স্থানীয় প্রধানদের অন্যতম ছিলেন রাজা মুকুন্দ রায়। তার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল ভূষণা। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মুকুন্দ রায়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র সত্রাজিৎ রায় রাজকীয় মুঘল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু সতেরো শতকের প্রথম দিকে তিনি মুঘলদের কাছে পরাজিত হন। পরবর্তীতে সত্রাজিতের পুত্র সীতারাম বাস্তবতা উপলব্ধি করে মুঘল আধিপত্য মেনে নেন। এর ফলে তিনি ভূষণা এবং ফতেহাবাদ অঞ্চলের জমিদারি পুনরুদ্ধার করেন এবং ধীরে ধীরে বিপুল ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠেন।
সীতারাম ভূষণা থেকে প্রায় সতেরো কিলোমিটার দূরে বাগজানী নামক স্থানে তার রাজধানী স্থাপন করেন। রাজধানীকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি দীর্ঘ মাটির বাঁধ ও পরিখা নির্মাণ করেন। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে রাজধানীটি ছিল এক ধরনের দুর্গনগর। তবে ভূষণার ফৌজদারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। তার অবজ্ঞাসূচক মনোভাব এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফলে শেষ পর্যন্ত মুর্শিদকুলী খানের আমলে ১৭১৪ সালে তাকে দমন করা হয়। তার বিশাল জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে রাজশাহীর জমিদার রামজীবনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ভূষণা দুর্গ ছিল এই জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্তমানে দুর্গটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ফরিদপুর জেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কালিবাড়ি গ্রামে অবস্থিত। ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুমতি ও বরসিয়া নদীর মিলনস্থলের কাছে এর অবস্থান। মুঘল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত গ্রন্থ আকবরনামায় ভূষণাকে একটি সুদৃঢ় দুর্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভূষণার ইতিহাস আরও প্রাচীন। জানা যায়, এই অঞ্চলের প্রথম শাসনকর্তা ছিলেন ধেনুকর্ণ নামে এক শাসক। তিনি যশোরের উত্তরাংশ অধিকার করে ‘বঙ্গভূষণ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, তার এই উপাধি থেকেই অঞ্চলটির নাম হয় ‘ভূষণা’। পরে সুলতান নুসরত শাহের সময় ভূষণা বাংলার সতেরোটি টাকশাল শহরের একটি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে ষোড়শ শতকের শেষ দুই দশকে ভূষণা হয়ে ওঠে মুঘল বাহিনী ও বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র। সম্রাট আকবরের আমলে এটি ফতেহাবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে মুর্শিদকুলী খান বাংলার রাজস্ব প্রশাসন পুনর্বিন্যাস করলে ভূষণা তেরোটি চাকলার একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এই ভূষণা চাকলার আওতায় অসংখ্য গ্রাম ও জনপদ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোষাখালী, হোগলা, হাবাসপুর, কুমারখালী, বেরামপুর, সাদাপুর, গুলিশপুর, বেলগাছি, কলকাপুর, জাহাজডিঙ্গা, কমলদীঘি, সেনপাড়া, বালিয়াকান্দি, কৃষ্ণপুর, ফরিদপুর, কানাইপুর, হীরাপুর, শহরভূষণা, গোপালপুর, মালিকনগর, তালমা, বাবুখালী, জয়নগর, রাজাপুর, মহম্মদপুর, কামারগাঁ, কালীনগর, মীরগঞ্জ, মুকসুদপুর, মহারাজপুর, দীঘলনগর, রঙ্গিগঙ্গ, কয়রা, শালখীয়া, খাজুরা, শ্রীরামপুর, আড়পাড়া, ডুকালী, দাউদপুর, কলনা, সামরুল, কালীয়া, গোপালগঞ্জ, গোবরা, টাঙ্গিপাড়া, ঘোড়াডাঙ্গা, শিবরামপুর, চাঁদপুরসহ আরও বহু জনপদ এই চাকলার অন্তর্গত ছিল। এমনকি খড়রিয়ার বিলসমষ্টির একটি অংশও এর আওতায় পড়ত।
সমগ্র প্রশাসন, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে যে ভূষণা সমৃদ্ধ ছিল আজ তার অধিকাংশই ইতিহাসের স্তরে চাপা পড়ে আছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গ, ছড়িয়ে থাকা স্থাননাম এবং পুরানো দলিলপত্রই এখন সেই গৌরবময় অতীতের সাক্ষ্য বহন করে। তবুও ইতিহাসের পাতা উল্টালে বোঝা যায় ভূষণা বাংলার রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক শক্তির উত্থান-পতনের এক জীবন্ত স্মারক।