মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
৪২৬৪৮
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০১০, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৭
জীবন কথন ॥ পাঁচ শ' টাকার শাপ-অভিশাপ
রণজিৎ বিশ্বাস
একেকটা বাক্যের সূত্র ধরে একেক বিষয় মনে পড়তে শুরু করেছে আজকাল।
: আপনি নতুন নন। তেমন অনেকেরই পড়ে। আমরা আপনার মতো অত কথা বলিও না, অত যা তা লিখিও না। আমাদেরও পড়ে। আপনার কী মনে পড়লো, সর্বশেষ?
: 'পাওনাদার ভোলে দেনাদার নয়।' গুরুজনেরা বলতেন, বন্ধুজনেরা বলতেন। বিশ্বাসও করতাম। কিন্তু, একবার নয়, দু'বার নয়, নিজের ছোট জীবনে বার বার তার উল্টো ছবি দেখেছি।
: যেমন, একবার এক কবি আমার কাছে বেশ কিছু টাকা চেয়েছিল। দশ হাজার টাকা। খুব ঘনিষ্ঠ আমার নয়, তবু চেয়ে বসলেন। তার আগে তিনি প্রচুর বাষ্পায়ন ও অজস্র তৈলায়ন সারলেন এবং আমার ব্যক্তিগত জীবনের বেশ কিছু বেদনার দুঃখের ও ব্যর্থতার সংবাদ পাড়লেন। চাকরি ৰেত্রের ব্যর্থতার কথা এবং লোকান্তরনিবাসে বড় অকালে চলে যাওয়া একমাত্র পুত্রকেন্দ্রিক ক্রন্দনের কথা।
মাথায় আমার মগজের ঘাটতি যতই থাকুক, বুঝতে পাচ্ছিলাম, এসব বলার জন্য তিনি ফোন করেননি। তাও জীবনে প্রথমবার। এর পরে নিশ্চয় অন্যকিছু অপেৰা করছে। প্রস্তুত হলাম।
সেই প্রস্তুতির মাঝে তিনি আসল কথাটি পাড়লেন। বাড়িওয়ালার বড় উপদ্রবে আছেন, পনেরো হাজার হলে ভালো হয়, নিদেন দশ হাজার তো লাগবেই। অন্যের কাছে চাইলেই তো তিনি পেয়ে যান, কিন্তু চাইছেন না, চাইতে তার মন উজোচ্ছে না। আমাকে তিনি 'অন্যরকম' জানেন বলেই, অনেক ভেবে চিনত্মে, চাইছেন। আমি যেন তাকে নিরাশ না করি। আমি যেন তাকে না ডোবাই।
: আপনার কাছে যে অত টাকা আছে, অথবা চাইলেই যে জীবনের প্রথম ফোনকলে সাড়া দিয়ে অত টাকা আপনি দিয়ে ফেলবেন, তিনি ভাবতে পারলেন কী করে!
: সে আমার বোঝার অতীত।
: হতে পারে আপনি যে বোকা, বুদ্ধিশূন্য, সরল প্রকৃতির ও ইডিয়ট টাইপের লোক তিনি বুঝতে পেয়েছিলন, অথবা তার কোন বন্ধু তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
: হতে পারে। বিচিত্র কিছু নয়। আমার অনেক 'বন্ধ'ু আছে।
: ধার দেয়ার মতো তত টাকা আপনার ছিল?
: ছিল। তার চেয়ে বেশিও ছিল। সম্পর্কভেদে আমি এক কথায় অথবা কথনও কখনও উপযাচক হয়ে তা দিয়ে দিতাম।
: এ ৰেত্রে কী করলেন?
: না করতে পারলাম না। আবার পুরোপুরি 'হ্যাঁ' ও না। বলস্নাম, আসুন না দেখি, কত টাকা আছে বুঝতে পাচ্ছি না। কাউকে ব্যাংকে পাঠাচ্ছি।
: আমি কিন্তু টাকাটা কয়েকদিনের মধ্যেই শোধ করে দেবো!
: ততো দেবেনই। আমিও তো তাই আশা করবো।
: তাহলে পাচ্ছি?
: দেখি না কতটা কী করতে পারি।
: তাহলে আসছি?
: আসুন।
: তারপর?
: তারপর সবকিছুই ইন্টারেস্টিং। আমার শ্রমের জায়গা তখন তেজগাঁয়, তার চাকরি উত্তর কমলাপুরে, নটর ডেম কলেজের কাছাকাছি। দূরত্ব অনেক। কিন্তু, তিনি যেন উড়ে চলে এলেন। তিন বা চার চাকার গাড়িতেই হয়ত চেপেছিলেন; এবং আমার নিমসম্মতি পাওয়ামাত্রই। স্বাভাবিক! তিনি তো ভাবতেই পারেন, শিকার যখন পেয়েছি, তাড়াতাড়ি তার ঘাড় মটকানোই ভালো। তাছাড়া ট্যাঙ্েিত কিছু ইনভেস্ট করতে অসুবিধে কী। একটু পড়েই তো বেশ কয়েক হাজার টাকা আমি পকেটে পেড়ে যাচ্ছি। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই তিনি আমার দরোজায় ন'ক করায় আগেই খুব দ্রম্নত বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেলো।
: কী কী?
: আমি ফোন রেখেই দশ হাজার টাকায় একটি চেক লিখে পাঠিয়ে দিলাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে আসবে, আমি অপেৰা করছি আর ভাবছি-কাজটা কি ঠিক হচ্ছে।
এমন সময় দরজায় এক 'দেবদূত' উপস্থিত। অনুজপ্রতিম। সাংবাদিক। ঘনিষ্ঠ। এক সময় ঋণপ্রার্থীজনার সহকর্মী ছিলেন। ওকে জিজ্ঞেস করলাম_অই লোকটি কেমন? জবাব_কেন, টাকা চেয়েছে?/চেয়েছে। বেশ বড় অঙ্কের।/কত?/দশ হাজার।/দিচ্ছেন?/কথা তো এক রকম দিয়ে ফেলেছি!/আপনি মরেছেন।/লোকটি আসলে কেমন?/ ভয়াবহ।/তাই?!/একটু কমই বললাম তবু তাই ধরে নিতে পারেন। আমি আর বসব না। লোকটি এখনই আসবে, আর আমাকে দেখে নির্ঘাত ধরে নেবে_ আমি আপনাকে নিষেধ করেছি।
: তাহলে আপনার 'দেবদূত' প্রস্থান করলেন?
: হঁ্যা! মিনিট-দু'মিনিটের মধ্যেই। এক রকম দৌড়ে পালাল। তার 'পালাবার' পরপরই টাকাটা আমার হাতে এল, এবং সঙ্গে সঙ্গেই আমি যে রম্নমে ঢুকলাম, তার নাম টয়লেট। ভিন্ন এক কাজে। বান্ডিল থেকে পাঁচ শ' টাকার একটি নোট আলাদা করে বুক পকেটে রাখলাম। সিটে এসে ঘামতে থাকলাম। এই লোকটিকে কি জবাব দেব! কি করে আমি তাকে ট্যাকল করব! অন্য কোথাও কি চলে যাব! না, তাও তো কোন ভাল কৌশল হবে না। বলি হওয়ার জন্য বসে থাকলাম।
: ছবিটা যেন আমি দেখতে পাচ্ছি।
: হয়ত পাচ্ছেন। তিনি এলেন। দরজা নক করলেন, তা খুলে দীর্ঘাঙ্গ নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়ালেন। তার অর্থ হয়ত এই_ ছাগল, তোমাকে আমি ঠিক সময়ে ধরেছি। দেহ থেকে বর্জ্য নিঃসরণের সময় যখন তোমরা খুব নাজুক অবস্থায় থাক, তখনই তোমাকে আমি আটকাতে পেরেছি। তার একটা এঙ্টেনডেড অর্থ হচ্ছে_ তোমাকে আজ আমি বধ করবই করব।
তাকে বসতে আহ্বান করলাম। চা-বিস্কুটের অর্ডার দিলাম। তিনি তাতে একেবারেই আগ্রহ দেখালেন না। বললেন_ ব্যাংক থেকে লোক তো এসে গেছে?/এসে গেছে।/তাহলে দাদা আমি আর দেরি করব না। ট্যাঙ্ িদাঁড়িয়ে আছে।/ট্যাঙ্েিত এসেছেন?/আসব না! আমার না আর্জেন্সি!?/কিন্তু, খবর তো ভাল নয়।/ভাল নয় মানে!!!/চেক ফেরত এসেছে। ব্যাংক অত টাকা নেই।/কত আছে?/খুব কম। একেবারেই কম। কখন যে তুলে ফেলেছি জানাই ছিল না।/তাহলে! আমি তো আপনার ওপর নির্ভর করেই এতদূর এলাম!/আমারও তো ইচ্ছে ছিল কিছু একটা করব।/তা আর হলো কোথায়! আমাকে এভাবে নিরাশ হতে হবে! এরকম বিপদে পড়তে হবে!/আমার কি কিছু করার ছিল?/ এখন কি করে বলি!/
তামাটে কালারের মুখটায় কালশিটে দাগ ফেলে আমার সকল বিরক্তির মাঝে তিনি কয়েক মিনিট বসে রইলেন। তারপর বললেন_ কাজটা ঠিক হলো না।
রাগ হচ্ছিল। তবু বললাম_ খুব যদি দরকার হয়, পকেটে পাঁচ শ' আছে। দেব? কিছু বললেন না। চুপ করে থাকলেন। অনেকৰণ।
আমি কাজ করার ও ব্যর্থ থাকার অভিনয় করছিলাম। অকারণে লোকজন ডাকছিলাম। আমার অভিনয়ও ভাল হচ্ছিল না, তিনিও উঠছিলেন না। পাথরের খ-ের মতো চেয়ারের ওপরে ওজন দাবিয়ে বসেছিলে। ততৰণে বোঝার বাকি ছিল না, নিচে কোন ট্যাঙ্ িদাঁড়িয়ে নেই।
হঠাৎ, রেগেই যেন বলে উঠলেন_ দিন!/কি দেব?/ আর কি দেবেন! আমার কপাল যখন খারাপ, ঐ পাঁচ শ' টাকাই দিন!
: পাঁচ শ' টাকা তিনি নিলেন?! যার দরকার দশ হাজার, তিনি পাঁচ শ'য় মানলেন?!
: আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ লোক ভাবতে ভাবতে ও শাপ-অভিশাপের সাগরে ডোবাতে ডোবাতে মানলেন। বিরূপ প্রকৃতির প্রচুর আশিস-আশীর্বাদ আমি কষ্টের পাঁচ শ' টাকায় চিরদিনের জন্য কিনে নিলাম।
: এখন তিনি কোথায়?
: ঢাকাতেই আছেন! কিছুদিন আগে একটি পুরস্কারও পেয়েছেন?
: দেখা হয়?
: হয়! আমাকে তিনি আর চেনেন না। আমাকে করা তার প্রথম ফোনকলটিই হয়ে গেল একমাত্র দূরালাপন।
: লাগছে কেমন?
: ভাল। অসাধারণ!
লেখক : শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক