মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
১০৯৯৫৩
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০১০, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৭
আওয়ামী লীগ যা পারে, যা পারে না
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেৰণ হচ্ছে, দলটি দেশ ও জাতি গঠনে যে সব ঐতিহাসিক ভূমিকা গোড়া থেকে পালন করে আসছে তা সময়মতো কখনও জনগণকে বলার দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে আওয়ামী লীগের অতীত অনেক মহৎ কাজ সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম খুব বেশি কিছু জানে না। এগুলোর গুরুত্বও তাই যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না। সেই দায়িত্ব আওয়ামী লীগ পালন করেনি। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে অন্য কোন রাজনৈতিক দলের তুলনাই করা অসম্ভব ব্যাপার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশিরভাগ সময় দলটি ৰমতার বাইরে ছিল। হিসাব করলে এই সময়টি হবে ৫০ বছরের বেশি। এই পঞ্চাশ-বায়ান্ন বছর বিরোধী দলে থেকেও আওয়ামী লীগ জনগণকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেশে গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে, একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, অর্জন করেছে। সবচাইতে বড় সাফল্য এই দলের যে, দলটি বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সফল একটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানের মাধ্যমে বাসত্মবে রূপদান করেছে। এই একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেই দলটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও জাতি অননত্মকাল আওয়ামী লীগকে স্মরণ না করে পারত না। তবে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার মহাষড়যন্ত্র কয়েকবারই হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে যেভাবে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ নেতৃবৃন্দকে হত্যা, জেলে বন্দী করে রাখা, আওয়ামী রাজনীতিকে ধর্ম ও গণতন্ত্রবিরোধী আখ্যায়িত করে অপপ্রচারের অসম যুদ্ধে ফেলা হয়, রাষ্ট্রৰমতা থেকে দূরে রাখার দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করা হয় তা ছিল অবিশ্বাস্য। সেই অবিশ্বাস্য পাহাড়সম দেয়াল অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে লড়াই সংগ্রাম করে শুধু নিজের অসত্মিত্বই নয়, দেশ ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকেও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০০৪ সালেও আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তাতে ৰতিগ্রসত্ম হলেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, বরং জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ আরও বেশি দেশের প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে নস্যাত করার সকল ষড়যন্ত্র অবশেষে ব্যর্থ করা সম্ভব হলো, ছবিযুক্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ইতিহাসের স্মরণাতীত বিজয় নিয়ে ৰমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে। গত ৬২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ রাজনীতির অঙ্গনে এভাবেই বিস্ময়কর নানা অর্জন, আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার পর্ব অতিক্রম করে এগিয়ে চলছে। অনেকেই অতীতে সবজানত্মার মতো ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন যে, দলটি মুসলিম লীগের মতো খ--বিখ-িত হতে কিংবা বিলুপ্তি হতে আর বেশি দেরি নেই। কিন্তু তাদের কারও কোন ভবিষ্যদ্বাণীই শেষ পর্যনত্ম বাসত্মবে রূপ নেয়নি, কারণ তারা জানতেন না যে তারা নিজেরাই এত বড় ভবিষ্যদ্বাণী দেয়ার মতো প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন না। অথচ তারা নিজেদেরকে ভবিষ্যত দ্রষ্টার আসনে বসিয়ে রাজনীতির কথা বলেছেন। বাংলাদেশে এ ধরনের বক্তব্য দেয়ার মতো লোকের অভাব এখনও নেই। তবে যেটির বড় অভাব তা হচ্ছে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র রাজনীতির গভীর বিশেস্নষণ করা, জনগণ এবং রাজনীতিবিদদের দেশের রাজনীতির জটিল গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া, করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা, সেভাবে নিজেদেরকে গড়ে তোলা।
উপরের সূত্র ধরে আবারও বলছি, আওয়ামী লীগ ৬২ বছরের ইতিহাসে তিনবার বিরতি দিয়ে এ পর্যনত্ম মাত্র ১০ বছর ৰমতায় ছিল বা আছে। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়া এবং ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে ৰমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সময়টি ছিল জাতীয় জীবনে একটি বিশেষ ধরনের ঐতিহাসিক কাল পর্ব। যে পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু দেশের হাল ধরেছিলেন তা কোন স্বাভাবিক সময় ছিল না। যুদ্ধবিধ্বসত্ম হাজারো সমস্যাপীড়িত হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিৰানীতি প্রণয়নসহ মৌলিক বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব উদ্যোগের গুরম্নত্ব অনেকেই বুঝতে পারে না। মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশ শাসনে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সরকার এ সবের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সেই গুরম্নত্বই এখনও পর্যনত্ম অনেকেই বুঝতে পারছেন না, পারার মতো উদ্যোগই হয়ত কেউ নেয়নি। এ সম্পর্কে কোন মূল্যায়ন, গবেষণা, ব্যাখ্যা বিশেস্নষণ ইতোপূর্বে হয়নি। অধিকন্তু, রাজনীতিতে এ নিয়ে পৰে বিপৰে তথ্যপ্রমাণ-উপাত্তবিহীনভাবে অনেক গলাবাজি করা হচ্ছে। এতে পরবতর্ী প্রজন্ম বেশ বিভ্রানত্ম হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে না স্বাধীনতা উত্তরকালের সমস্যা ও সঙ্কট কত জটিল ও বিসত্মৃত ছিল, সেই অবস্থার মধ্যেও তখনকার সরকার দেশকে আধুনিক আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে কীভাবে গড়ে তুলতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল তা চাপা পড়ে গেছে, বোঝা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই শুধু শুনছে শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করে গণতন্ত্র হত্যা করেছে, বাক স্বাধীনতা হরণ করেছে, পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে ইত্যাদি। বিষয়গুলো নিয়ে কোন গবেষণা নেই, সিরিয়াস কোন লেখালেখি, একাডেমিক বা সাধারণ আলোচনাও নেই। অথচ বঙ্গবন্ধু যে দেশটিকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখলেন, সেই দেশটি স্বাধীনতা লাভের পর তিনি একটি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করে গতানুগতিক একজন সরকারপ্রধানের মতো ৰমতায় থেকে বিদায় নেবেন একথা যারা ভাবতে পারেন তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কতটা বুঝতে পারেন, ঐতিহাসিক বাসত্মবতা কতটা বুঝতে পারেন, মূল্যায়ন করতে পারেন সেসব নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গড়ে তোলার ৰেত্রে পরীৰা-নিরীৰায় অবতীর্ণ হবেন, নতুন নতুন পথের সন্ধান করবেন_ এটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র-রাজনীতি, শিৰা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি বিনির্মাণের সেই পর্বের যাবতীয় কর্মকা- তখন বা পরবতর্ীকালে যথাযথভাবে জনগণকে অবহিত করা, বোঝার সুযোগ করে দেয়ার তেমন কোন উদ্যোগ দলগতভাবে আওয়ামী লীগ কখনও নেয়নি। ফলে রাষ্ট্র ৰমতার কর্মযজ্ঞ নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব অনেক ৰেত্রেই রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের কাজগুলো নিজেরা জনগণের কাছে স্পষ্ট করে কখনও তুলে ধরতে পারেনি। ফলে আওয়ামীবিরোধী অবস্থান থেকে দেশের সকল অপশক্তি আওয়ামী লীগের তৎকালীন কর্মকা-কে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে এসেছে। বিকৃত রাজনীতির ইতিহাসের শিকার স্বাধীনতাউত্তর প্রজন্ম একথা স্বীকার করতে হবে। এর খেসারত আওয়ামী লীগকে অনেকদিন দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ উত্তরকাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যনত্ম গণতন্ত্রের পুনরম্ন্তূানের আন্দোলন এবং সামরিক শাসনবিরোধী রাজনীতির আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই ও নেতৃত্ব প্রদান করে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেনি। অথচ সাংগঠনিকভাবে নাজুক অবস্থায় থেকেও বিএনপি নির্বাচনে জয়লাভ করে বাজিমাৎ করে দিতে পেরেছে। এর কারণ হচ্ছে, দেশে রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলন চললেও একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে গড়ে তোলার ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, সেই রাজনীতির আলোচনা, পর্যালোচনা, নেতা-কমর্ী ও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি যথাযথভাবে করা হয়নি। ফলে আন্দোলনে জয়লাভ করলেও যেহেতু সেই আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতের মতো শক্তি অংশীদার ছিল তাই বিভ্রানত্ম রাজনীতির শিকার প্রজন্ম সসত্মা অপপ্রচারের অবস্থানেই থেকে গেছে, আওয়ামী লীগ ৰমতায় এলে 'সংবিধান থেকে বিস্মিলস্নাহ চলে যাবে', 'বাকশাল কায়েম হবে', 'বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে' ইত্যাদি জুজুর ভয়ে বিএনপির কাছেই বেশিরভাগ ভোটার ফিরে যায়। ১৫ বছরের মগজ ধোলাইয়ের বিশ্বাস এবং অবস্থান থেকে ব্যাপক জনগোষ্ঠী সরে না আসতে পারার কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিনের বিভ্রানত্মি এবং অপপ্রচারের রাজনীতি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালে বিএনপির শাসনের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন এবং ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রম্নয়ারির একতরফা নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় মানুষ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়, প্রবল আন্দোলনের মাধ্যমে ১৫ ফেব্রম্নয়ারির তথাকথিত নির্বাচিত সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে, এর ফলে বিএনপির প্রতি দুই দশকের বিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরে, কিন্তু তারপরও আওয়ামী ভীতির প্রচারণার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি ব্যাপক মানুষ। আওয়ামী লীগ প্রবল আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অনত্মভর্ুক্ত করার কৃতিত্ব পেলেও ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগকে অন্যদের সমর্থন নিয়ে ৰমতায় আসতে হয়েছে। আওয়ামীবিরোধী মানসিকতা এবং ভীতির অনেকটা অবসান থেকেই ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র ৰমতায় আওয়ামী লীগকে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৯৬-২০০১ সাল সময়ে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শানত্মি চুক্তি, ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী ঘটে যাওয়া শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা, অর্থনীতি, শিৰা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনরম্নদ্ধার ইত্যাদি কর্মকা- সফলভাবে করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগের শাসনকে নতুনভাবে প্রত্যৰ করেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যে আওয়ামী ভীতি কার্যকর ছিল, ইসলাম বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার যে ভীতি কাজ করেছিল এর অনেকটাই অমূলক বলে প্রমাণিত হয়। তারপরও আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের মানসিকতা এবং ধারা বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে যে গতিতে সমাজের সর্বত্র পঁচাত্তরউত্তরকালে সেসব অপপ্রচার ও বিভ্রানত্মি সংক্রমিত হচ্ছিল তা অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে আসে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিজেদের আমলের কর্মকা-কে সঠিকভাবে তুলে ধরেনি, এসব কর্মকা-ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেমন হতে পারে তাও খুব একটা ব্যাখ্যা বিশেস্নষণ করে তুলে ধরেনি। যেমন, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসন আমলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে নেয়ার ৰেত্রে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে সাদামাটা কিছু কথাবার্তার বাইরে তেমন কোন প্রচার প্রচারণা হয়নি। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ শাসন আমল দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের মাত্র প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার, এছাড়া আর্থ-সামাজিক ৰেত্রে সেই শাসন আমলকে অনেকভাবে সফল একটি সময়ও বলা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই সময়েই তাদের কর্মকা- নিয়ে জনগণের মধ্যে তেমন কোন প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেয়নি। অধিকন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস জেগে ওঠে যে, অনেক বছর পর ৰমতায় এসে দেশ পরিচালনায় যেহেতু সরকার বেশ সাফল্যের প্রমাণ রেখেছে, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে, তাই জনগণ পরবতর্ী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আবার ৰমতায় ভোটের মাধ্যমে নিয়ে আসবে_এমনই ধারণা ছিল। কিন্তু টিআইবির রিপোর্টে বাংলাদেশ শীর্ষ দুনর্ীতিগ্রসত্ম দেশ হিসেবে উঠে আসায়, একই সঙ্গে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর কর্মকা- মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে উঠে আসায় আওয়ামী লীগ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ প্রতিহত করতে পারেনি রাজনৈতিকভাবে এসব প্রচার-প্রচারণার জোয়ারকে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে এ ধরনের প্রচার-প্রচারণার সামাজিক প্রতিক্রিয়া কতখানি গভীর হতে পারে সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। অধিকন্তু মাঝারি পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের অনেকেই দলীয় প্রাথর্ীদের বিরম্নদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে, নির্বাচনে বিপর্যয় ঘটার পরিণতি দল, দেশ ও জনগণের কী হতে পারে এর কিছুই বিবেচনায় নেয়নি। ফলে মহাবিপর্যয় ঘটে গেছে ২০০১ সালের নির্বাচনে। এর জন্য আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-জামায়াতের চরম নির্যাতন ও নিবর্তনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দলগতভাবে আওয়ামী লীগকে চরম সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হয়েছে, দেশেও মৌলবাদী শক্তি এই সুযোগে ব্যাপকভাবে উত্থান ঘটার সুযোগ লাভ করে। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশ যে গভীর সঙ্কটে পড়েছিল তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে আওয়ামী লীগকে আন্দোলন সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সকল সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এৰেত্রে দলগত, জোটগত এবং ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অবস্থা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করেছে তা বিশেষভাবে উলেস্নখ করার মতো। দিনবদলের স্বপ্ন জাগিয়ে আওয়ামী লীগ তরম্নণ সমাজকে নতুনভাবে নাড়া দিতে পেরেছে, যুদ্ধাপরাধ, ভিশন ২০২১, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া ইত্যাদি মানুষকে আশাবাদী করেছে। নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রভাবও পড়েছে।
এই মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার শুরম্ন থেকেই ব্যাপক কর্মযজ্ঞে হাত দিয়েছে। আনত্মর্জাতিক ৰেত্রে বাংলাদেশ বেশ মর্যাদার একটি অবস্থান গত দেড় বছরে তৈরি করতে পেরেছে। দেশের অভ্যনত্মরে কৃষি, খাদ্য, শিৰা, সংস্কৃতি, আইন-বিচার ইত্যাদি সর্বৰেত্রেই সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো বেশ তৎপর। শেখ হাসিনা এই মেয়াদে যে ধরনের অভিজ্ঞতা, দৃঢ়তা, আস্থা এবং আনত্মরিকতা নিয়ে কাজ করছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। সরকার নির্বাচনী ইশতেহার বাসত্মবায়নে এবার যেভাবে সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে তা আগে কোন সরকারের মধ্যে দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার সেই কাজটিও শুরম্ন করেছে। ভূমিদসু্যদের হাত থেকে ঢাকা শহর বাঁচানোর মতো জনগুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও সরকার বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতিহাস বিকৃতির বিরম্নদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে দেশে উলেস্নখ করার মতো কাজ হচ্ছে। শিৰা ব্যবস্থায় যেভাবে দিনবদলের প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছে তা আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে অনেক দূর এগিয়ে এনেছে। আরও অনেক ৰেত্রেই নীরবে অনেক কাজ হচ্ছে, হবে। কিন্তু যে কাজটি মোটেও হচ্ছে না তা হলো সরকারের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা, দিনবদলে এসব কাজ আগামী দিনে কিভাবে ভূমিকা রাখবে, কি কি জটিলতা বর্তমান সরকার প্রতিদিন অতিক্রম করে এগুচ্ছে তা জানানো দরকার। বস্তুত শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার যেভাবে কর্মযজ্ঞে ব্যসত্ম হয়ে আছে, সেভাবে কিন্তু বিষয়গুলো জনগণের কাছে আসছে না, সরকার কিভাবে বিদু্যত, গ্যাস, কয়লা, পানিসহ জাতীয় সম্পদ রৰা এবং ব্যবহারের বিষয়গুলো চিনত্মা করছে তাও কিন্তু মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। মানুষ কিছু কিছু ৰেত্রে পরিবর্তনের লৰণ দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণ এবং তাদের চিনত্মা-ভাবনার বিষয়গুলোকে একাত্ম করা আবশ্যক। তা হলেই ছোটখাটো ভুলভ্রানত্মি, বিচু্যতিতে মানুষ অতীতের মতো বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়ার কথা ভাববে না। নতুবা ভবিষ্যতে সরকারের বিরম্নদ্ধে মহলবিশেষের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রে অনেকই বিভ্রানত্ম হবেন না তা কিন্তু নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায় না। সে কারণে, বিশেষভাবে প্রয়োজন হচ্ছে সরকার যেসব মৌলিক পরিবর্তনে হাত দিয়েছে, কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করছে_ তার ফলে আগামী দিনে আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাসত্মবতা কতখানি নিশ্চিত সেটিই ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। তাহলেই মানুষ দিনবদলের নীরব প্রক্রিয়ার সঙ্গে চেতনাগতভাবে একাত্ম থাকবে। এর জন্য দলের নেতা-কমর্ীদের দিনবদলের রাজনৈতিক কমর্ী হিসেবে গড়ে উঠতে হবে, ভূমিকা রাখতে হবে, জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। বর্তমানে তৃণমূল, মাঝারি, এমনকি উপর পর্যায়েও অনেকই গতানুগতিক ধারার রাজনীতির নেতাকমর্ীদের মতো নিজেদের নিয়ে ব্যসত্ম আছেন, জনগণ থেকে নিজেদের এবং দলকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন। এর ফলাফল আর কিছু নয়, শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিপরিষদ যত ভাল কাজই করম্নক নির্বাচনের সময় ভাল কাজের তালিকা হারিয়ে যাবে, আবেগ, অপপ্রচার, ভুল-ভ্রানত্মি, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকমর্ীদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, সভাপতিবাজি ইত্যাদি ইসু্যতে গোটা আওয়ামী লীগই নয়, মহজোটও ডুবে যেতে পারে। সে কারণে এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে অবহিত করা, সচেতন করা, আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারায় সম্পৃক্ত করার কাজ করতে হবে। যে কাজটি অতীতে আওয়ামী লীগ যথাযথভাবে করেনি। এর জন্য দল এবং জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আশা করি এবার আওয়ামী লীগ সেই ভুল না করে এখনই হাত দেবে, জনগণের সঙ্গে মিশে যাবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়