মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
১১১৫০১
বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০০৯, ৫ অগ্রহায়ন ১৪১৬
বাংলাদেশে জোট আমলেই উলফার বিস্তৃতি
সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ উলফা-৩
মামুন-অর-রশিদ বাংলাদেশে উলফার শীর্ষ পর্যায়ের এক ডজন নেতা বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে উলফা নেটওয়ার্ক এখানে বিস্তৃতি লাভ করে। অভিযোগ আছে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় উলফাকে ব্যবহার করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উলফার গোপন তৎপরতা রোধে আঞ্চলিক পর্যায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধের কথাই বলছেন সবাই। বাংলাদেশের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী অবশ্য উলফার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের 'স্বাধীনতাকামী' অভিহিত করে বিভিন্ন সময় সহযোগিতার দাবি তুলেছে। যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেছে আজ তারাই উলফাকে স্বাধীনতাকামী বলে সমর্থন করছে। তাদের এই দাবি উলফা প্রশ্নে পাকিস্তানের গতিপথই সমর্থন করছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে। উলফার কর্মকাণ্ড, তৎপরতা এবং গতিবিধি অনুসন্ধানেই এ অঞ্চলে উলফার শক্তিশালী নেটওয়ার্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকারী কিংবা জঙ্গীগোষ্ঠী এখন বিশেষ কোন দেশের একক সমস্যা নয়। এটি এখন আঞ্চলিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেই বিচারে সন্ত্রাসবাদ নিমর্ূলে আঞ্চলিক পর্যায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলাও অসম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই প্রধান রবার্ট মুলার গত ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সফরে এসে সে দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা এমকে নারায়ণের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেছেন, হরকত-উল-জিহাদসহ জঙ্গী সংগঠনগুলো পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে তাদের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। এখন তারা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের ঘাঁটি তৈরি করছে। রবার্ট মূলার শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত সন্ত্রাসবিরোধী দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেন। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জঙ্গীবাদসহ সকল ধরনের সন্ত্রাস মোকাবেলায় আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাস নিমর্ূলে শেখ হাসিনার এ প্রস্তাব সমর্থন করেছেন।

বিএনপি-জামায়াত আমলে
বাংলাদেশে উলফার বিস্তৃতি
বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে ২০০৬ সালে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি গ্রুপের সন্ধান পায় গোয়েন্দারা। তখন সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের একটি মজুদ উদ্ধার করা হয়। কথিত আছে, ১৯৯২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরই সরকারের সক্রিয় সমর্থনে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। জোট সরকারের আমলে তাদের অবাধ কার্যক্রম পূর্বের তুলনায় প্রকাশ্য রূপলাভ করে। নিরাপদ আস্তানা হিসেবে তারা শেরপুর জামালপুর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার গারো পাহাড়গুলো বেছে নেয়। হালুয়াঘাটের মনিকুড়ায় ২০০৬ সালে উদ্ধার হওয়া ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বলে প্রমাণিত হয়। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী 'ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অব বোড়োল্যান্ড' সদস্যরা ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে হালুয়াঘাটে গোলাবারুদ মজুদ করেছিল। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এত বড় অস্ত্রের চোরাচালান কিভাবে হালুয়াঘাটে এসে পৌঁছে সেই প্রশ্ন তৈরি হয় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে। প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া কোনভাবেই এত বড় অস্ত্রের চোরাচালান সম্ভব নয় বলে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে তখন ধারণা তৈরি হয়। বিগত জোট শাসনামলে সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তারা এ এলাকায় অবস্থান নেয়। উলফা নেতারা অনেকে এ অঞ্চলে বিয়ে ও ব্যবসাবাণিজ্য করে অনেকটা স্থায়ী বাসিন্দাদের মতো হয়ে উঠেছে। প্রচুর অর্থবিত্তের কারণে তাদের এসব এলাকায় ব্যাপক প্রভাববলয়ও তৈরি হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় উপযর্ুপরি গ্রেনেড হামলায় উলফার প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের জেএমবি জঙ্গীরা ব্যবহার করেছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় সামনে রেখে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি বিশেষ অরাজকতা সৃষ্টিতে উলফাকে ব্যবহারে তৎপর রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের হাতে তথ্য রয়েছে।
বাংলাদেশে উলফা
নেতাদের অবস্থান

বাংলাদেশে উলফার তৎপরতা রয়েছে বলে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এখানে উলফার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে মনিপুরে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন 'পিপলস ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট' (পিইউএলএফ)। দক্ষিণ এশিয়ার গোয়েন্দা সূত্রসমূহ দাবি করেছে, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বাংলাদেশের একটি বিশেষ মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশবিরোধী এ শক্তি এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কৌশল অবলম্বন করেছে। একই সঙ্গে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যাপক প্রসারে বাংলাদেশ বিরোধীশক্তি মদদ দিয়েছে। এশিয়ার একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়া, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অব বোরোল্যান্ডে'র (এনডিএফবি) চেয়ারম্যান রঞ্জন দাইমারী, কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) চেয়ারম্যান জীবন সিংহ, ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (এনএলএফটি) চেয়ারম্যান বিশ্বমোহন দেব বর্ম, অল ত্রিপুরা টাইগার্স ফোর্সের (এটিটিএফ) সভাপতি রণজিৎ দেব বর্ম ছদ্মবেশে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। পরেশ বড় ুয়া কামারুজ্জামান খান নামে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করার তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের হাতে। একই সঙ্গে উলফার চীফ অরবিন্দ রাজখোয়া ইনামুল হক নামে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য মিলেছে গোয়েন্দাদের হাতে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে। জোট আমলে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চোরাচালান তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এ অস্ত্র চোরাচালানের বিস্তারিত তথ্যচিত্রে এ সম্পর্কিত অনেক তথ্যই এখন বেরিয়ে আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এনএসসিএন চেয়ারম্যান ইসাক সু এবং এন্থনি শিমরাই চীনের কুনমিং থেকে চলতি বছরের ৭ মে ব্যাঙ্কক আসেন এবং ১১ মে তারা ঢাকায় আসেন। তাদের দু'জনের সঙ্গেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছিল। কেবল অস্ত্রের নিরাপদ রুট নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপারেশন প্যান বাস্তবায়নেরও রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের আন্তরিক অতিথিপরায়ণতার সুযোগ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা খুব ভালভাবেই ব্যবহার করছে।